সোমবার, জানুয়ারি ১৭, ২০২২
সোমবার, জানুয়ারি ১৭, ২০২২

আবেগ কাকে বলে এবং আবেগের বৈশিষ্ট্য কী?

রাগ, হিংসা, আনন্দ, ভয় এসব দিয়ে মনের যে বিশেষ অবস্থাকে বুঝি তাকেই আবেগ বলে।

প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। মানুষ যুক্তিশীল প্রাণী। তার আচরণ যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেচনা নির্ভর। তা সত্ত্বেও মানুষের অধিকাংশ আচরণ আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। শিশুর আচরণকে ভালভাবে বুঝতে হলে তার আবেগ সম্পর্কে বুঝতে হবে।

আবেগ কী?

মনের একটি বিশেষ অবস্থার সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক। কোনো কোন উদ্দীপকের প্রতি সাড়া দেওয়ার ফলে আমাদের দেহ মনে বিশেষ প্রতিক্রিয়া বা আলোড়নের সৃষ্টি হয়। তার ফলে কান্না, হাসি, দুঃখ, রাগ ইত্যাদি নানা ধরনের অভিজ্ঞতা অনুভব করি আর প্রকাশ করি। 

এগুলোই হচ্ছে আবেগ।

আবেগ ব্যাখ্যা করা বেশ একটা জটিল কাজ। ক্ল্যাপারীড বলেছেন ‘আবেগের মনস্তত্ত্ব মনোবিদ্যার এক জটিল বিষয়’। এর সংজ্ঞা প্রদানে মনোবিজ্ঞানীরা দারুনভাবে ভিন্ন মতানুসারী। “ আবেগ অনুভুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিন্তু আবেগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শারীরিক বহিঃপ্রকাশ। আবেগ মনের একটি বিচলিত অবস্থা। একটা “stirred up state of agitation.” ল্যটিন ইমোভার (Emovere) থেকে ইংরেজি Emotion শব্দ এসেছে যার অর্থ হলো প্রক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হওয়া। তাই বলা যায় আবেগ হলো মনের সেই স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশমান অবস্থা যা ব্যক্তিকে দৈহিক এবং মানসিক দিক থেকে বিচলিত করে।

যখন কোনো ব্যক্তি আবেগের দ্বারা প্রভাবিত হয় তখন সে দেহে মনে উত্তেজিত অবস্থায় থাকে তার স্বাভাবিক সাম্যাবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। 

ম্যাকযুগাল প্রবৃত্তিমূলক ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত মানসিক অবস্থাকে আবেগ বলেছেন। কেউ কোনো বিশেষ বস্তুর সঙ্গে যুক্ত অনুভুতিম লক অবস্থাকেই আবেগ বলেছেন।

এ প্রসঙ্গে আমরা ড্রেবার এর সংজ্ঞা বিবেচনা করতে পারি।

ড্রেবার-এর মতে “আবেগ একটি জটিল মানসিক অবস্থা, যাতে বিভিন্ন প্রকারের শারীািরক পরিবর্তন ঘটে এবং মনে একটা জোরালো মনোভাব তৈরি হয় যার জন্য বিশেষ একটা কিছু করার ইচ্ছে জাগে। এই অনুভুতি খুব তীব্র হলে বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে এবং অসতর্ক ভাবে কোনো কিছু করার প্রবৃত্তি হয়।”

আবেগ বিশ্লেষণ

আবেগ অনুভুতির সামগ্রিক এবং বিচলিত অবস্থা। খুশীতে উচ্ছল হওয়া, ভয় পাওয়া, বিস্ময়ে অবাক হওয়া, রাগে উত্তেজিত হওয়া সব আবেগেই মনের অনুভুতি আর তার দৈহিক প্রকাশ নিবিড় ভাবে জড়িত। রাগ, হিংসা, আনন্দ ইত্যাদিতে মনের যে বিশেষ অবস্থা বুঝায় তাই আবেগ। আবেগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উত্তেজিত হওয়া। 

আবেগ মূলক পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করলে তিনটি দিক পাওয়া যায়।

  • বাহ্যিক আচরণ
  • অভ্যন্তরীন প্রতিক্রিয়া
  • আবেগমূলক অনুভুতি বা সচেতনতা।

আবেগের প্রকাশ হচ্ছে বাহ্যিক আচরণে। যেমন রাগ হলে হাত পা ছোঁড়া আর অভ্যন্তরীন প্রতিক্রিয়া যেমন রক্তচলাচল সম্পর্কিত অথবা পেশী ঘটিত অথবা স্লায়ুঘটিত দৈহিক পরিবর্তন আবেগের ক্ষেত্রে অবশ্যই থাকবে। আবেগ মূলক অনুভূতি বা সচেতনতা- সুখকর বা দুঃখকর বা যেমনই হোক-একটা অনুভুতি আবেগ জাগার সঙ্গে থাকবেই। 

আবেগ অনুভূতিজাত। অনুভূতি যখন প্রবল হয়ে দৈহিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়ে তখনই সেটা আবেগ। 

আনন্দ,বিরক্তি ইত্যাদি দ্বারা আমরা যে উত্তেজিত বা বিচলিত অবস্থাকে বুঝি সেটাকে আবেগ বলি। আবেগের মানসিক দিক হলো অনুভূতি। আর শারীরিক দিক হলো নানারকম শারীরিক পরিবর্তন। আবেগের অভিজ্ঞতায় শারীরিক আর মানসিক প্রতিক্রিয়ার সংমিশ্রণ দেখা যায়। 

এই আবেগ মানবজীবনের এক প্রয়োজনীয় দিক। আবেগ কাজের পেছনে শক্তি জোগায়, মানব আচরণের ধরন ও প্রকৃতি নিয়ন্ত্রন করে। 

বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে আবেগের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর শিক্ষাগ্রহণ, শিক্ষায় অগ্রগতি,তার মানসিক সংগঠন, তার ব্যক্তিত্ব-সব কিছু নির্ভর করে তার আবেগিক বিকাশের উপর। সুষম আবেগিক বিকাশ সুষম ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলে।

আবেগের বৈশিষ্ট্য

আবেগের নিজস্ব কতকগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। বৈশিষ্ট্যগুলো নিুরূপ:

  • আবেগ জাগানোর জন্য উদ্দীপক প্রয়োজন। উদ্দীপক ছাড়া আবেগ সৃষ্টি হয় না। 
  • পারিবেশিক উত্তেজনা ব্যক্তির মধ্যে অনেক আবেগ তৈরি করে। বাইরের যে-কোনো বস্তু বা বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা ধারনা সব কিছুই আবেগ সৃষ্টি করতে পারে। কোনো ব্যক্তির অশোভন আচরণে আমরা যেমন রেগে যেতে পারি। তেমনি কষ্টকর কোনো অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণ করে কাঁদতে পারি। অথাৎ আবেগ জাগ্রতকারী উদ্দীপক বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার হতে পারে। 
  • আবেগের সঙ্গে দেহের সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কের জন্যই অনুভূতি ও আবেগ দুটো আলাদা হয়েছে। আবেগের সঙ্গে কম বেশি শারীরিক পরিবর্তন হবেই। হাসলে মুখের পরিবর্তন হচ্ছে । যখন খুব রাগ হয় তখন আমরা চিৎকার দিয়ে কথা বলি, হাত পা ছুড়ি। 
  • আবেগের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর স্থায়ীত্ব। আমরা হঠাৎ রেগে যাইনা বা হঠাৎ রাগ থেমে যায় না। ধীরে বৃদ্ধি পায় ধীরে কমতে থাকে।
  • আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আবেগ জড়িত। কোনো প্রবল ইচ্ছা বা আকা খাকে জোর করে অবদমন করলে আবেগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে এটা ড্রেভারের মত।আবেগের আরেক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অনেক সময় আবেগ দৈহিক অবস্থা থেকে সৃষ্ট হয়। যেমন অসুস্থ অবস্থায় কেউ বিরক্ত করলে খুব রাগ হয়।

এ সব বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে বলা যেতে পারে যে কোনো বিশেষ বস্তু বা অভিজ্ঞতার প্রতি আমাদের যে মানসিক অনুভুতি তার বাহ্যিক প্রকাশিত রূপই হচ্ছে আবেগ।

রাগ, হিংসা, আনন্দ, ভয় এসব দিয়ে মনের যে বিশেষ অবস্থাকে বুঝি তাকেই আবেগ বলে।

রাগ, হিংসা, আনন্দ, ভয় এসব দিয়ে মনের যে বিশেষ অবস্থাকে বুঝি তাকেই আবেগ বলে। আবেগ মনের এক বিচলিত ও উত্তেজিত অবস্থা। সব আবেগেই মনের অনুভূতি আর তার দৈহিক প্রকাশ জড়িত। ১. আবেগমূলক পরিস্থিতিতেবাহ্যিক আচরণ; ২. অভ্যন্তরীন প্রতিক্রিয়া; ৩. আবেগ মূলক সচেতনতা – এই তিনটি দিক বিদ্যামান থাকে। শিশুর শিক্ষা গ্রহন, মানসিক সংগঠন, ব্যক্তিত্ব গঠনে আবেগের প্রভাব অনেক বেশি।

আবেগের বৈশিষ্ট্যগুলো হল: ১. আবেগের জন্য উদ্দীপক প্রয়োজন; ২. আবেগ শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়; ৩. এর স্থায়ীত্ব আছে; ৪. আকাংখা আর দৈহিক অবস্থার সঙ্গে আবেগ জড়িত।

হক, মু. না., হোসেন, দি., আক্তার, শা. (১৯৯৭). শিশু ও শিক্ষা মনোবিজ্ঞান. বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন

সেরা দশটি বিভাগ

এই বিষয়ের আরও নিবন্ধ