নেতা কাকে বলে ও নেতার কার্যাবলি কী?

কাপ্তান যেমনিভাবে জাহাজ নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যায়, তেমনিভাবে নেতা তার অনুসারীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে সঠিক পথে চালিত করেন এবং সাফল্যের সাথে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন করেন।

যে ব্যক্তি একটি দল বা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য দিক নির্দেশনা প্রদান করেন এবং প্রদান করা নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন রকম প্রচেষ্টা চালান তাকে নেতা বলে। নেতা শব্দের ইংরেই প্রতিশব্দ হলো লিডার (leader)। নেতার মোহনীয় ব্যক্তিত্ব, আচার-ব্যবহার ইত্যাদি অনুসারীদের আকৃষ্ট করে। তাই নেতাকে পুরো দায়িত্ব নিয়ে নানা কার্যসম্পাদন করতে হয়। তাহলে আসুন এ সম্পর্কে পাঠটি শেষ করে জেনে নিই।

নেতার কার্যাবলি (Functions of a Leader)

প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মীদের সঠিক পথে চালিত করাই নেতার মূল কাজ। তবে এ কাজ করার জন্য নেতাকে প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়ের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর রাখতে হয়। যার ফলে নেতাকে সর্বদা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ (Check and Balance) করে চলতে হয়।

  1. লক্ষ্যস্থিত করা (Fixing goals): নেতাকে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যের সাথে মিল রেখে তাঁর নিজের কাজের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। এর ভিত্তিতে তিনি পরবর্তীতে কর্মপন্থা এবং নীতিমালা প্রস্তুত করেন। 
  2. সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তুতকরণ (Preparing organizational structure): লক্ষ্য অর্জনের জন্য নেতাকে দায়-দায়িত্ব বণ্টন, জবাবদিহিতা নিরূপণ, বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়সাধন ইত্যাদি কার্য সম্পাদনের জন্য একটি সংগঠন কাঠামো তৈরি করতে হয়। সফলতা অর্জনের জন্য উত্তম সংগঠন কাঠামো প্রয়োজন।
  3. কর্মী নির্বাচন (Employee Selection): নেতার একটি বিশেষ কাজ হলো প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানো এবং ভবিষ্যত নেতা তৈরি করা। অধীনস্তগণ নেতার কাছ থেকে নেতৃত্বের গুণাবলী আত্মস্থ করবে এটাই স্বাভাবিক। সে জন্য নেতাকে অবশ্যই যোগ্য কর্মী নির্বাচন করতে হবে যাতে কার্য সম্পাদনে অসুবিধা না হয়।
  4. নির্দেশনা প্রদান (Direction): প্রতিষ্ঠানের মানবীয় ও অমানবীয় সম্পদ যতই থাকুক না কেন, নির্দেশনার অভাব হলে তার যথাযথ ব্যবহার হবে না। সে কারণে নির্দেশনা দান করা নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
  5. কার্যকর তদারকি (Effective Supervision): অধীনস্তদের যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে কাজে লাগানো এবং সে কাজের কার্যকর তদারকি করার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা নেতার অন্যতম কাজ।
  6. কার্যকর সমন্বয়সাধন (Effective coordination): প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগ, উপ-বিভাগ, শাখা এবং বিভিন্ন কর্মীর মধ্যে সমন্বয় করার কাজটি নেতাকেই করতে হয়। সমন্বয়ের কাজটি সুষ্ঠু না হলে তিনি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবেন।
  7. ঐক্য সংরক্ষণ (Safeguarding Unity): স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কারণে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মধ্যে ঐক্যে ফাটল ধরে। এতে দলীয় সংকীর্ণতা দেখা দিতে পারে। কর্মী ও বিভাগসমূহের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা তাই নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
  8. কর্মীর আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করা (Influencing behaviour): নেতা প্রতিনিয়ত অনুসারীদের ভালো-মন্দ খোঁজ-খবর নিবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি তাদের দুর্দশা লাঘবে প্রচেষ্টা চালাবেন। এ ধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে নেতা কর্মীর আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করেন। 
  9. প্রতিনিধিত্ব করা (Representing): নেতাকে অবশ্যই তাঁর প্রতিষ্ঠান/অনুসারীদের জন্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। প্রতিনিধিত্বমূলক কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে তিনি বাইরের জগতে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেন। 
  10. যোগাযোগ (Communication): নেতাকে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভাগ, উপবিভাগ, শাখা ও কর্মীদের সাথে সর্বদা যোগাযোগ করতে হয়। তিনি কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়ে থাকেন।
  11. উদ্বুদ্ধকরণ (Inspiring): নেতা অনুসারীদের নানা অভাব পূরণ, সান্তনাসূচক বক্তব্য এবং স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করেন। 
  12. পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো (Adapting with Changes): বিশ্ব পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে কাজের ধরন পরিবর্তিত হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নেতাকে পরিবর্তিত প্রযুক্তি গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। একজন আদর্শ নেতা সর্বদা এ ধরনের প্রযুক্তি গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানের কর্মসম্পাদন উন্নত করেন। 

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কাপ্তান যেমনিভাবে জাহাজ নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যায়, তেমনিভাবে নেতা তার অনুসারীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে সঠিক পথে চালিত করেন এবং সাফল্যের সাথে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন করেন।

এ বিষয়ের আরও নিবন্ধ

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বলতে কী বোঝায়

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (Human Resource management) হলো একই সঙ্গে একটি অধ্যয়নের বিষয় ও ব্যবস্থাপনা কৌশল যা একটি প্রতিষ্ঠানের...

ডিজিটাল লোন: ডিজিটাল লোন অ্যাপ কী এবং এর সুবিধা ও অসুবিধা

কার অর্থের প্রয়োজন নেই? মাঝেমধ্যেই আমাদের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার কারণে প্রায়শই বিভিন্ন খাতে খরচ করতে হয়। সব সময় যে...

প্রশাসন এবং ব্যবস্থাপনার ধারণা, পরিসর ও পার্থক্য

কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নীতি প্রণয়ন করা প্রশাসনের কাজ এবং সে নীতিগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা দেখাশোনা ও তদারকি করার দায়িত্ব...

Banking: বাংলাদেশে কি টাকার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি?

ব্যাংকিং খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয়। ব্যাংকের অন্যতম কাজ হলো দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার চাকা সচল রাখতে ঋণ দেয়া এবং সময়মতো সে...
আরও পড়তে পারেন

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলতে কী বোঝায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখাবিশেষ যেখানে পরিচালন প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতি সম্পর্কীয় বিষয়াবলী নিয়ে আলোকপাত করা হয়।  এরিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে রাষ্ট্র...

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কী বা গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়

গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের অথবা কোনো সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বা পরিচালনাব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক...

সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, অসুবিধা ও অর্থনীতি

সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল ১৯১৭ সালে। সমাজতন্ত্রে বৈরি শ্রেণি নেই, কেননা কলকারখানা, ভূমি, সবই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সমাজতন্ত্রে শ্রেণি...

জীবনী: সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ছিলেন একজন বাঙালি লেখক ও কবি। তিনি উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রবক্তাদের একজন। সিরাজী মুসলিমদের...

জীবনী: সুভাষ মুখোপাধ্যায়

বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় একটি হলো "ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত"; এই উক্তিটি কার জানেন? উক্তিটি পশ্চিমবঙ্গের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের।...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here