বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

স্টাফিং বা কর্মীসংস্থান কাকে বলে এবং কর্মীসংস্থানের গুরুত্ব কী?

কর্মীসংস্থানের প্রধান কাজ হলো দক্ষ ও যোগ্য কর্মীবাহিনী সংগ্রহ ও সংরক্ষণ।

প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মীবাহিনী দরকার। কর্মীসংস্থান বা স্টাফিং বর্তমান ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কর্মী চাহিদা অনুযায়ী তা পূরণ করে। স্টাফিং এর ধারণা অত্যন্ত ব্যাপক। কর্মী সংগ্রহ করা হতে শুরু করে, কর্মী নির্বাচন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ সবকিছুই কর্মীসংস্থান বা স্টাফিং-এর অন্তর্ভুক্ত। জনসম্পদ হলো একটি প্রতিষ্ঠানের মূল হাতিয়ার বা চালিকাশক্তি। তাই ব্যবস্থাপকরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রতিষ্ঠানের কর্মী সংক্রান্ত বিষয় বিবেচনা করেন। দক্ষ কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তার লক্ষ্যার্জন করতে সক্ষম হয়। কর্মীসংস্থান প্রশ্নটি বিশেষভাবে অনুন্নত দেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যেখানে বেকার সমস্যা অত্যন্ত প্রকট। সেইজন্য ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত সঠিক ও গুরুত্ব সহকারে কর্মী সংস্থানের প্রক্রিয়া সম্পাদন করতে হয়।

স্টাফিং বা কর্মীসংস্থানের সংজ্ঞা (Definition of Staffing)

ধরুণ, কোনো একটি কোম্পানি তার বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য কিছু Staff Executive নিয়োগ করতে চায়। এ জন্য তারা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলো এবং তার ফলশ্রুতিতে বেশ কিছু সংখ্যক আবেদনপত্র জমা পড়ল। এ আবেদন পত্রের মধ্য হতে কিছু সংখ্যক আবেদনকারীকে কার্ড ইস্যু করা হলো এবং সাক্ষাৎকার নেয়া হলো এবং দুইজনকে নিয়োগ দেয়া হলো। কোম্পানিটির এই কার্যগুলো স্টাফিং-এর অন্তর্ভুক্ত।

বাংলা ‘কর্মীসংস্থান’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘স্টাফিং’ (Staffing)। সাধারণভাবে কর্মীসংস্থান বলতে কর্মী সংগ্রহ বা যোগাড় করা বুঝালেও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে কি ধরনের কত সংখ্যাক কর্মীর প্রয়োজন হবে তা নির্দিষ্টকরণ, সেই অনুযায়ী যথাযথ উৎস বাছাই করে তা থেকে প্রয়োজনীয় কর্মী সংগ্রহ, নির্বাচন এবং তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় কার্য ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াকেই কর্মীসংস্থান নামে অভিহিত করা হয়। 

ওইরিচ ও কুঞ্জ (Weihrich and Koontz)-এর মতে, “সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন পর্যয়ে কর্মীদের শূণ্যস্থান পূরণ ও নিয়োগকৃত কর্মীদের যথাস্থানে সংরক্ষণ করাই হলো কর্মীসংস্থান। যা সম্পাদিত হয় সংগঠনের প্রতিটি পর্যায়ে কি পরিমাণ ও মানের কর্মীর প্রয়োজন হবে তা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় কর্মী সংগ্রহ, কর্মীদের তালিকাভুক্তকরণ, যথাব্যক্তিকে যথাস্থানে নিয়োগ, পারিশ্রমিক ও পদোন্নতি প্রদান, কর্মী মূল্যায়ন, কর্মীদের ব্যক্তিক উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রশিক্ষণ দান যাতে তারা দক্ষতার সাথে উত্তমভাবে কাজ সম্পাদন করতে পারে।” 

জে. এল. ম্যাসি (J. L. Massie)-এর মতে, “কর্মীসংস্থান হলো এমন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যবস্থাপক অধীনস্থদের নির্বাচন করেন, প্রশিক্ষণ দেন, পদোন্নয়ন ও অবসর প্রদান করেন। উপর্যুক্ত সংজ্ঞা দুটি বিশ্লেষণ করলে কর্মীসংস্থান প্রক্রিয়ায় মধ্যে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়:

  • ক. সংগঠন কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে কি মানের ও কোন পরিমাণের কর্মীর প্রয়োজন হবে তা নিরূপণ করা; 
  • খ. সঠিক উৎস বাছাই করে তথ্য হতে প্রয়োজনীয় কর্মী সংগ্রহ ও নির্বাচন করা; 
  • গ. নিয়োগকৃত কর্মীদের উপযুক্ততা যাচাই করে যোগ্য ব্যক্তিরদের যথাস্থানে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা; 
  • ঘ. প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য ও কর্মীদের প্রয়োজন বিবেচনা করে উপযুক্ত বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা; 
  • ঙ. কর্মীদের উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করা; 
  • চ. কর্মীদের কাজ থেকে অবসর প্রদান বা প্রয়োজনে বাদ দেয়া। 

উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, কর্মীসংস্থান শুধু প্রতিষ্ঠানে কর্মী সংগ্রহের সাথেই সম্পৃক্ত নয় বরং সংগঠনের কোন পর্যায়ে কোন মানের কি পরিমাণ কর্মী প্রয়োজন হবে তা নির্ধারণ করা থেকে কর্মী নিয়োগ, কর্মী প্রশিক্ষণ, কর্মী পরিচালনা সংক্রান্ত কার্যের সবটাই কর্মীসংস্থানের সাথে সম্পৃক্ত। 

স্টাফিং বা কর্মীসংস্থানের গুরুত্ব (Importance of Staffing)

যে-কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে মানব এবং এই মানব সম্পদই প্রতিষ্ঠানের মেধা, প্রজ্ঞা, সৃজনশীলতা, উদ্যম ইত্যাদির যোগান দেয়। তাই পরিকল্পনা ও সংগঠনের পর ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কর্মীসংস্থান। যদিও কর্মীসংস্থানের কাজকে অনেকেই সংগঠন (organisation) কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন কিন্তু Weihrich and koontz এর নিম্নোক্ত চারটি কারণে কর্মীসংস্থানকে ভিন্ন কাজ হিসাবে দেখানে উচিত। 

  • ১. সংগঠনের কাজ এমনিতেই অনেক ব্যাপক। তাই কর্মীসংস্থানকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হলে কর্মীসংগ্রহ ও এতদ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির গুরুত্ব কমে যাবে। এতে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উভয়ে মনে করেন, সংগঠনের কাজ সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ, প্রত্যেক বিভাগ ও উপবিভাগের দায়িত্ব-কর্তৃত্ব নিরূপণ ও বন্টন এবং বিভাগসমূহের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণের প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। 
  • ২. কর্মীসংস্থানের কাজকে আলাদা করা হলে শুধুমাত্র কর্মী সংগ্রহই নয় প্রত্যেক পর্যায়ে কর্মীদের যথাযথ মান ও পরিমাণ নিরূপণ, কর্মীসংগ্রহ ও নির্বাচন, কর্মীদের ব্যক্তিক উন্নয়ন, কর্মী মূল্যায়ন-পরিকল্পনা গ্রহণ ও নির্বাহী উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব লাভ করবে। 
  • ৩. কর্মীসংস্থান সংক্রান্ত বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পাওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানের বা উর্ধ্বতনের এ সংক্রান্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়। 
  • ৪. কর্মীসংস্থানকে ব্যবস্থাপনার কাজ হিসাবে দেখানো হলে উচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপকগণ এ কাজটিকে শ্রমিক-কর্মী বিভাগের উপর সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিয়ে নিজেরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে।

উপর্যুক্ত আলোচনা হতে আমরা বলতে পারি যে, কর্মীসংস্থান বা স্টাফিং আধুনিক ব্যবস্থাপনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

কর্মীসংস্থানের প্রধান কাজ হলো দক্ষ ও যোগ্য কর্মীবাহিনী সংগ্রহ ও সংরক্ষণ।
কর্মীসংস্থানের প্রধান কাজ হলো দক্ষ ও যোগ্য কর্মীবাহিনী সংগ্রহ ও সংরক্ষণ।

নিম্নে কর্মীসংস্থানের গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো: 

দক্ষ ও যোগ্য কর্মীবাহিনী সংগ্রহ ও সংরক্ষণ (Recruitment and maintenance of an efficient workforce)

কর্মীসংস্থানের প্রধান কাজ হলো দক্ষ ও যোগ্য কর্মীবাহিনী সংগ্রহ ও সংরক্ষণ। মানবসম্পদ হলো প্রতিষ্ঠানের মূল হাতিয়ার। তাই এ সম্পদ সঠিকভাবে সংগ্রহ ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন কর্মীসংস্থান। কর্মীসংস্থানের মাধ্যমেই দক্ষ বাহিনী সংগ্রহ ও এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।

অন্যান্য উপরকরণাদির কার্যকর ব্যবহার (Effective utilisation of other input factors)

প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, অর্থ, বাজার, পদ্ধতি প্রভৃতি অমানবীয় উপকরণের কার্যকারিতা জনশক্তির দক্ষতার উপর নির্ভর করে। কর্মীসংস্থান প্রয়োজনীয় সংখ্যাক কাম্য মানের কর্মীসংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে অমানবীয় উপকরণসমূহের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে। 

মানব সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতকরণ (Ensuring effective utilisation of human resources)

ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মানব সম্পদ প্রতিষ্ঠানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানব সম্পদের যথাযথ সংগ্রহ ও উন্নয়নের উপর প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য নির্ভরশীল। কর্মী সংস্থানের কাজ হচ্ছে মানব সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতকরণ। এদিক থেকে প্রতিষ্ঠানিক সাফল্যের ক্ষেত্রে কর্মীসংস্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। 

প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য বৃদ্ধি (Increase of organisation success)

প্রতিষ্ঠানের জন্য জনসম্পদ পরিকল্পনা কর্মীসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ দিক। কর্মীসংস্থানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের চাহিদা মেটানো যায়। ভবিষ্যতের চাহিদাও পুর্বানুমান করা যায়। যার ফলে যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মীদের নিয়োগও দেয়া হয়। ফলে কাজের মান নিয়ন্ত্রিত হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য বৃদ্ধি পায়। 

ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজে সহায়তা দান (Facilitate other management functions)

ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কার্য যেমন পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও প্রেষণার সাথে কর্মীসংস্থান ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত উপকরনাদির আলোকে পরিকল্পনা করা হয় এবং প্রণীত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মূল হাতিয়ার হলো দক্ষ জনশক্তি। নির্দেশনার যথার্থতা ও এর বাস্তবায়ন কর্মীদের উপর নির্ভরশীল। কর্মীদের মান ও যোগ্যতা কর্মীসংগ্রহ ও নির্বাচনকালে নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে তাদের প্রেষণা দানের মাধ্যমে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না। 

উপসংহারে বলা যায় যে মানব সম্পদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে কার্যে জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দক্ষ জনবল সংগ্রহ ও তাদের উন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কর্মীসংস্থান এর গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ