শিক্ষাক্রম প্রণয়নের নীতিমালা

শিক্ষাক্রম প্রণয়ন একটি ধারবাহিক প্রক্রিয়া।  শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পরিমার্জন বা উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা রয়েছে। নিচে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের বেশকিছু সাধারণ নীতিমালা উল্লেখ করা হলো।

শিক্ষাক্রম প্রণয়নের নীতিমালা

শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কিছু অ্যাকাডেমিক নীতিমালা রয়েছে। নিচে এগুলো আলোচনা করা হলো-

  • শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: একটি দেশের শিক্ষানীতি এবং বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় দলিলে ঐ রাষ্ট্রের শিক্ষার লক্ষ্য কী হবে সে সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা উল্লেখ থাকে; শিক্ষাক্রমে এসব দিকগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে হয়।
  • শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক: শিক্ষাক্রম, শিক্ষার্থীর চাহিদা, আগ্রহ, সামর্থ, ধারণ ক্ষমতা ইত্যাদি দিককে ভিত্তি করে প্রণয়ন করতে হয়। অর্থাৎ শিক্ষাক্রম হবে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। বিভিন্ন ধরনের শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখার সুযোগ থাকতে হবে।
  • ব্যক্তির সামাজিক চাহিদার প্রতিফলন: মানুষ সামাজিক জীব। শিক্ষার্থী সমাজেই জন্মগ্রহণ করে ও বেড়ে উঠে। আধুনিক শিক্ষা ব্যক্তির নিজস্ব সত্ত্বা ও সামাজিক সত্ত্বা উভয় দিকের বিকাশকে গুরুত্ব দেয়। শিক্ষাক্রম প্রণয়নে এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • সৃজনশীলতার বিকাশ: শিক্ষার্থী নিজস্ব সম্ভাবনা ও সৃজনশীলতার উন্নয়ন শিক্ষার অন্যতম কাজ। সুতরাং, শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতার বিকাশকে গুরুত্ব দিবে। তাদের চিন্তাশক্তির বিকাশে জোর দিতে হবে।
  • ভবিষ্যৎমূখী করা: শিক্ষা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম হওয়া উচিৎ জীবনভিত্তিক। তবে শিক্ষা শুধু বর্তমান জীবন পরিস্থিতিকেই গুরুত্ব দিবে না;  শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও উন্নয়নে যুগপৎ সমাজের ভবিষ্যত চাহিদাকেও বিবেচনা করতে হবে।
  • জীবন ধারনের প্রস্তুতি: শিক্ষার্থীর পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কর্মকাণ্ড এবং এগুলোর মাধ্যমে কীভাবে ব্যক্তির জীবনের চাহিদাসমূহের পরিপূরণ হচ্ছে সে সম্পর্কে জানার সুযোগ শিক্ষাক্রমে থাকবে।
  • সংরক্ষণ করা: মানবজাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ও তাকে ভবিষ্যতমুখী করার অন্যতম মাধ্যম শিক্ষা। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ তার অর্জিত অভিজ্ঞতা সংরক্ষণের মাধ্যমে আগামী দিনের পরিবর্তনশীল সমাজের সাথে খাপ খাওয়ার উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের ভূমিকা দ্বিমুখী-
    • ১. অতীত অভিজ্ঞতার সংরক্ষণ
    • ২. ভবিষ্যত সমাজের মধ্যে তার সঞ্চালন।

শিক্ষাক্রম প্রণয়নে এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

শিক্ষাক্রম কী? শিক্ষাক্রমের ধারণা কী?
শিক্ষাক্রম প্রণয়নের নীতিমালা কী?
  • বিষয়বস্তুর সমন্বয় ও সহসম্পর্ক রক্ষা: শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যাতে বিষয়বস্তুসমূহ যৌক্তিকভাবে ও মনোবিজ্ঞানের নীতিমালা অনুযায়ী বিন্যস্ত হয়। এর ফলে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে যথার্থ সমন্বয় ও সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব হবে।
  • ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যকে গুরুত্ব দেওয়া: শিক্ষাক্রম এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে করে প্রতিটি শিশুর/শিক্ষার্থী আত্ম-প্রকাশ ও উন্নয়নের সুযোগ থাকে। এ লক্ষ্যে শিক্ষাক্রমকে ব্যক্তিক পার্থক্যের মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হবে যা আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় জটিলতা উপলব্ধি করতে ও তার সমাধানে সহায়ক হবে।
  • শিখন সক্ষমতা: শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি বিষয় বা বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীর শেখার উপযোগী হতে হবে। সেই সাথে বিষয়বস্তুসমূহের প্রয়োজনীয়তাও থাকতে হবে।
  • সামাজিক সংশ্লিষ্টতা ও উপযোগিতা: শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ এমনভাবে চয়ন করতে হবে যাতে করে শিখন ক্ষেত্র হিসেবে তার গুরুত্ব থাকে। সেই সাথে তার নিজস্ব গুরুত্ব, সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা ও উপযোগিতা থাকে।
  • অবকাশ সময়ের সদ্ব্যবহার: খেলাধুলা, শিল্পচর্চা, নান্দনিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সহায়ক বিষয়বস্তু শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অবসর সময়টাকে কার্যকর ও আনন্দঘন ব্যবহারের সুযোগ থাকবে শিক্ষাক্রমে।
  • বিভিন্নতার স্বীকৃতি ও নমনীয়তা: শিক্ষাক্রমের সাধারণ উদ্দেশ্য হবে সকলের স্বাভাবিক বিকাশ ও উন্নয়ন। তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্নতাকে (ছেলেমেয়ে, জাতি, গোষ্ঠী, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদি) মূল্যায়ন করবে ও প্রত্যেকের বিশেষ চাহিদার প্রতি গুরুত্ব আরোপ।
আহমেদ মিন্টো
মিন্টো একজন ফ্রিল্যান্স লেখক এবং বিশ্লেষণ'র কন্ট্রিবিউটর।
এ বিষয়ের আরও নিবন্ধ

দেশের উন্নয়নে নারী শিক্ষা

প্রাচীনকাল থেকে আমাদের দেশে প্রচলিত আছে যে, ‘সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে’। মানবসমাজে নারী ও পুরুষ পরস্পর নির্ভরশীল হলেও আগেকার দিনে নারীকে...

নতুন শিক্ষা কারিকুলামে প্রত্যাশা

শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। শিক্ষা হবে সর্বজনীন। শিক্ষা হবে সহজলভ্য, প্রাণচাঞ্চল্য। শিক্ষা হবে মানবিক, আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর। শিক্ষা মানুষকে লড়তে শেখায়...

বেহাল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হাল ধরবে কে?

'মাত্র দুটি বিভাগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়' শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছেন প্রথম আলোর সাংবাদিক মোশতাক আহমেদ। প্রতিবেদনের সারাংশতে বলা হয়, "১৯৯২ সালে বেসরকারি...

ধর্মীয় শিক্ষাকে কর্মমুখী করতে হবে

 এ দেশে মাদ্রাসা-শিক্ষাব্যবস্থা বেশ প্রসার লাভ করছে। দেশের সর্বত্র প্রা গ্রামেগঞ্জে মসজিদভিত্তিক মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। সেখানে দিনি-ইলম (ধর্মীয় শিক্ষা) চালু হয়েছে। কওমি...
আরও পড়তে পারেন

টপ্পা গান কী, টপ্পা গানের উৎপত্তি, বাংলায় টপ্পা গান ও এর বিশেষত্ব

টপ্পা গান এক ধরনের লোকিক গান বা লোকগীতি যা ভারত ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। এই টপ্পা গান বলতে...

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলতে কী বোঝায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখাবিশেষ যেখানে পরিচালন প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতি সম্পর্কীয় বিষয়াবলী নিয়ে আলোকপাত করা হয়।  এরিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে রাষ্ট্র...

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কী বা গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়

গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের অথবা কোনো সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বা পরিচালনাব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক...

সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, অসুবিধা ও অর্থনীতি

সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল ১৯১৭ সালে। সমাজতন্ত্রে বৈরি শ্রেণি নেই, কেননা কলকারখানা, ভূমি, সবই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সমাজতন্ত্রে শ্রেণি...

জীবনী: সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ছিলেন একজন বাঙালি লেখক ও কবি। তিনি উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রবক্তাদের একজন। সিরাজী মুসলিমদের...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here