বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

প্রদর্শন পদ্ধতি কাকে বলে? প্রদর্শন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও অসুবিধা কী?

প্রদর্শন পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত না হলেও শিখন শেখানো কার্যক্রমে এর গুরুত্ব খুব একটা কমেনি।

শ্রেণিকক্ষে ব্যবহৃত প্রদর্শন পদ্ধতি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগুলোর অন্যতম। শিক্ষক শিক্ষার্থী উভয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণে এ পদ্ধতি বিশেষ কার্যকর হয় বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ শিক্ষামনোবজ্ঞানীরা। প্রদর্শন পদ্ধতিতে কোনো তাত্ত্বিক বিষয়কে ব্যবহারিক পরীক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন সম্ভব। পরিকল্পনা মাফিক প্রয়োগ করতে পারলে প্রদর্শন পদ্ধতি ব্যবহারে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই উপকৃত হতে পারেন। 

প্রদর্শন পদ্ধতি কী (What is Demonstration Method)

সনাতন পদ্ধতি হিসেবে প্রদর্শন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। পাঠদানের যে পদ্ধতিতে পরিকল্পনা মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা উপকরণ ব্যবহার করে হাতেকলমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বা ব্যবহারিক ভাবে কোনো ঘটনা অথবা বিষয়বস্তু উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জনের চেষ্টা করা হয় তাকে শিখন শেখানো কার্যক্রমে প্রদর্শন পদ্ধতি বলে। প্রদর্শন পদ্ধতি এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে কোনো কিছু প্রদর্শন, বর্ণনাকরণ এবং অনুশীলনের সুযোগ বিদ্যমান।

প্রদর্শন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যাবলি

পাঠদানের প্রদর্শন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য নিচে উল্লেখ করা হলো-

  • পাঠদানের বিষয়টিকে সহজ করার জন্য হাতেকলমে করে দেখানো এবং পরীক্ষার সময় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অংশসমূহ শিক্ষার্থীর নিকট ব্যাখ্যা করা, ইত্যাদি প্রদর্শন পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
  • প্রদর্শন পদ্ধতি যদি শিক্ষককেন্দ্রিক
  • প্রদর্শন পদ্ধতি সনাতন পাঠদান পদ্ধতির অন্তর্গত।
  • সনাতন ও শিক্ষককেন্দ্রিক হলে পাঠদান সফল হয়।
  • প্রদর্শন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা সাধারণত নিষ্ক্রিয় শ্রোতা ও দর্শক (বক্তৃতা পদ্ধতির মতই) হিসেবে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেও পাঠ্যবিষয় অনুধাবন করতে অপেক্ষাকৃত বেশি তৎপর হয়।
  • প্রদর্শন পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞান আহরণ করে তা বাস্তব।

প্রদর্শন পদ্ধতির সুবিধা বা উপযোগিতা 

সনাতন পদ্ধতির অন্তর্গত হওয়া সত্ত্বেও এটি নিম্নলিখিত সুবিধাদি ও উপযোগিতার জন্য শিক্ষাদান ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়-

  • প্রদর্শন পদ্ধতি একটি সক্রিয় পদ্ধতি বিশেষ; যদিও এই সক্রিয়তা শিক্ষকের বেলায় যতটা শিক্ষার্থীর বেলায় ততটা প্রযোজ্য নয়।
  • শিক্ষার্থীরা প্রদর্শন পদ্ধতির মাধ্যমে কিছুটা হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার সুযোগ পায়; কেননা এই পদ্ধতিতে মৌখিক বিবৃতির পাশাপাশি উপকরণের ব্যবহারের মাধ্যমে আলোচ্য বিষয় জীবন্ত করে শিশুর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
  • প্রদর্শন পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থী যে জ্ঞান আহরণ করে তা বাস্তব বটে।
  • যে সব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যানুপাতে যন্ত্রপাতি ও উপকরণের অভাব সেখানে এই প্রদর্শন পদ্ধতিতে অপেক্ষাকৃত স্বল্প সংখ্যক যন্ত্রপাতি ও শিক্ষোপকরণ ব্যবহার করে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দেওয়া যায়।
  • প্রদর্শন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সক্রিয় রেখে পাঠ্য বিষয় অনুধাবনে সচেষ্ট হতে হয়।
  • প্রদর্শন পদ্ধতিতে শিক্ষকের বিবৃতি শ্রবণ ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে শোনার প্রয়োজন হয়, দর্শন ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে প্রদর্শিত উপকরণ দেখাতে হয় এবং শিক্ষকের বিবৃতি ও রূপকের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য তাদের মনকেও রাখতে হয় সচেতন ও সক্রিয়।
  • শিক্ষার্থীদের আরো সক্রিয় করার জন্য শিক্ষক প্রাসঙ্গিক কাজে তাদের সহায়তা নিতে পারেন। যেমন: যন্ত্রপাতি সাজাতে, ধরতে, উপকরণ এগিয়ে দিতে প্রয়োজন মতো তিনি নিজের তদারকিতে ভাল ও বুদ্ধিমান শিক্ষার্থীদের দ্বারা ছোটো-খাটো ও সহজ প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করতে পারেন।
  • শিক্ষার্থীদের মধ্যে অংশগ্রহণ ও কিছু করার একটা আত্মতৃপ্তি আসে এবং তারা শিখনে উৎসাহিত হয়।
  • প্রদর্শন পদ্ধতি শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষার বিষয়বস্তুর একটা স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠিত করে। 
  • শিক্ষার্থী শিক্ষার বিষয়বস্তু সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণের সময় শিক্ষকের বিবৃতি ও প্রদর্শিত উপকরণের মধ্যে একটা যোগসূত্র দেখতে পায়।
  • সকল শিক্ষার্থীর জন্য এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি। 
  • সবার অংশগ্রহণ ও অনুশীলনের সুযোগ প্রদর্শন পদ্ধতিতে থাকে।
প্রদর্শন পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত না হলেও শিখন শেখানো কার্যক্রমে এর গুরুত্ব খুব একটা কমেনি।
প্রদর্শন পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিমুক্ত না হলেও শিখন শেখানো কার্যক্রমে এর গুরুত্ব খুব একটা কমেনি।

প্রদর্শন পদ্ধতির অসুবিধা বা সমস্যা 

উপরোল্লিখিত গুণাবলি থাকা সত্ত্বেও প্রদর্শন পদ্ধতি সম্পূর্ণচাবে দোষত্রুটি থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। নিচে প্রদর্শন পদ্ধতির কিছু অসুবিধা বা সমস্যা উল্লেখ করা হলো-

  • প্রদর্শন পদ্ধতির স্বাভাবিক ও প্রধান  বৈশিষ্ট্য শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান হওয়ার কারণে ধীর শিক্ষার্থীরা সমস্যার মুখে পড়তে পারে।
  • যদি শিক্ষার উপকরণ অপ্রতুল হয় তবে এই পদ্ধতি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।
  • উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যেক শ্রেণিতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকে বলে প্রদর্শন পদ্ধতিতে পাঠদান সমস্যা হয়ে ওঠে।
  • মৌখিক বিবৃতি, উপকরণ ব্যবহার এবং শ্রেণি শৃঙ্খলার প্রতি সজাগ দৃষ্টি- একাধারে এই তিন দায়িত্ব পালন করা শিক্ষকের পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে।
  • শিক্ষার্থীর নিজ হাতে কাজ করার সুযোগ এখানে খুব একটা নেই, তাই প্রদর্শন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা তেমন ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।
  • প্রদর্শন পদ্ধতিতে শিক্ষকের যথেষ্ট দক্ষতা ও প্রস্তুতির প্রয়োজন, যার সুযোগ সব সময় তাঁর থাকে না।
  • প্রশ্নোত্তর, আলোচনা ও পরীক্ষা কাজে সহায়তা দানে শুধু মেধাবী শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে আসে, ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রদর্শন পদ্ধতি একটি সনাতন ও শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতি হওয়ার পরেই আধুনিক যুগের পাঠদান বা শিখন-শেখানো কার্যক্রমে এর গুরুত্ব কমেনি। প্রদর্শন পদ্ধতির কিছু স্বাভাবিক ত্রুটি বা অসুবিধা বাদ দিলে একে একটি দুর্দান্ত শিখন-শেখানো পদ্ধতি হিসেবে ধরা যায়।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ