বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

জেন্ডার কাকে বলে? জেন্ডার সমতা, সাম্য, লেন্স এবং বৈষম্য কী?

ঐতিহাসিকভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে কাজ এবং ক্ষমতার বিভাজন বা সম্পর্কের ভিত্তিতে জেন্ডারের ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, যা পুরুষ নারীর তুলনায় উত্তম এ ধারণাটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সাধারণভাবে বা সঙ্কীর্ণ অর্থে জেন্ডার শব্দের অর্থ বলতে অনেকে লিঙ্গ বা সেক্স (Sex) বুঝে থাকেন। তবে জেন্ডার মানে লিঙ্গ বা সেক্স নয়। Gender and Sex are not same.

জেন্ডার কী তা জানার আগে জানতে হবে যে, সেক্স কী। এখানে জেন্ডার ও সেক্স পদ দুইটির মধ্যে পার্থক্য জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সেক্স কী? (What is Sex)

সেক্স হলো একজন মানুষের জন্মগতভাবে নির্ধারিত জৈবিক অবস্থা যার মাধ্যমে নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠনগত পার্থক্য বোঝানো হয়। 

জেন্ডার কী? (What is Gender?)

সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একটি সমাজের নারী-পুরুষের প্রত্যাশিত ভূমিকা ও আচরণকে জেন্ডার বলে।

সমাজে একজন নারী-পুরুষ অথবা ছেলে-মেয়ে কী করবে, কী করতে পারবে না সমাজ কর্তৃক তা নির্ধারণ করে দেওয়াই হচ্ছে জেন্ডার।

ঐতিহাসিকভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে কাজ এবং ক্ষমতার বিভাজন বা সম্পর্কের ভিত্তিতে জেন্ডারের ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, যা পুরুষ নারীর তুলনায় উত্তম এ ধারণাটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

জেন্ডারের ধারণা মানুষের সৃষ্ট, অন্যদিকে সেক্স হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট মানুষের জৈবিক বেশিষ্ট্য। অতএব, জেন্ডারের সাথে সেক্স এর সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। Gender refers to the socially determined ideas and practices of what it is tube male or male.

জেন্ডার সমতা (Gender Equality)

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে সম্পদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার সমবন্টনকে জেন্ডার সমতা বলে। আর যখন এক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয় তাকে বলে জেন্ডার অসমতা। নারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অসমতা বিশ্বের সকল সমাজে কম-বেশি লক্ষ্য করা যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম মূলক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী অসমতার মুল কারণ।

জেন্ডার সাম্য (Gender Equity)

জেন্ডার সাম্য প্রত্যয়টি মূলত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগত ব্যাপার। নারী-পুরুষ তথা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের চাহিদাকে সমানভাবে উপলব্ধি করা এবং সে অনুযায়ী সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষ উভয়কে সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মনোভাব ও বাস্তবায়নকে জেন্ডার সাম্য বলে। জেন্ডার সাম্য জেন্ডার সমতা সৃষ্টিতে অবদান রাখে। অন্যদিকে জেন্ডার অসাম্য সমাজে অসমতার বীজ বপন করে।

জেন্ডার বিশ্লেষণ (Gender Analysis)

জেন্ডার বিশ্লেষণ বলতে কোন সমাজ ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে লিঙ্গভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করাকে বুঝায়। সমাজে নারী ও পুরুষের প্রত্যাশিত ভূমিকা আছে। এই ভূমিকাই নারী পুরুষের পছন্দ অপছন্দ, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানার্জন, চাহিদা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সম্পদের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ লাভ ইত্যাদিকে প্রভাবিত করে। কিন্তু জেন্ডার ভূমিকার অসম নিয়ন্ত্রণের কারণে নারী, পুরুষ যে কেউই বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে যা তাদের উন্নয়নের গতিরোধ করতে পারে।

জেন্ডার বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ বৈষম্য সম্পর্কে জানা যায়। ফলে নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে সকলের চাহিদা পূরণে সঠিক নীতিমালা, কর্মসূচি ও প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হয়।

জেন্ডার লেন্স (Gender Lens)

জেন্ডার লেন্স হলো এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে পুরুষের পাশাপাশি নারীর চাহিদা, অংশগ্রহণ ও বাস্তব অবস্থাকে সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। জেন্ডার লেন্স প্রক্রিয়ার উপকরণগুলো হলো- চেকলিস্ট, জরিপ ইত্যাদি।।

মূলধারায় জেন্ডার অন্তর্ভুক্তকরণ (Gender Mainstreaming)

মূলধারার নীতি নির্ধারণী সংস্থা ও ব্যবস্থায় জেন্ডার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি এবং কাঠামোতে নারী উন্নয়ন ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা, প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মধ্যে বিদ্যমান জেণ্ডার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা, সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকাণ্ডে জেণ্ডার সমতা রক্ষাই হচ্ছে মূলধারায় জেন্ডার অন্তর্ভুক্তকরণ।

ঐতিহাসিকভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে কাজ এবং ক্ষমতার বিভাজন বা সম্পর্কের ভিত্তিতে জেন্ডারের ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, যা পুরুষ নারীর তুলনায় উত্তম এ ধারণাটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

জেন্ডার বৈষম্যের কারণ ও ফলাফল (Cause and Effect of Gender Dissimilation)

যখন লিঙ্গগত পার্থক্যের কারণে নারী ও পুরুষের প্রতি সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে পার্থক্য করা হয়, তখনই জেন্ডার বৈষম্য সৃষ্টি হয়। সমাজের পুরুষ ও নারীর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরাজমান জেন্ডার অসমতাই হচ্ছে জেন্ডার বৈষম্যের ভিত্তি। পুরুষদের প্রতি বেশি Favoritism এবং নারীদের প্রতি অসম আচরণ এ বৈষম্যের ভিত্তি। 

গতানুগতিক মূল্যবোধ, সাক্ষরতার নিম্নহার ও নিম্নমানের শিক্ষা, সচেতনতার অভাব, যথাযথ নির্দেশনার অভাব, পারিবারিক দায়িত্বের বোঝা ইত্যাদি বহুবিধ কারণ এ ধরনের অসম আচরণ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। এসব কারণগুলোকে বিশ্লেষণ করলে জেন্ডার বৈষ্যমের কারণগুলোকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করা যায়:

  • ১. সংস্কার
  • ২. জৈবিক
  • ৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক
  • ৪. অর্থনৈতিক
  • ৫. শিক্ষাগত
  • ৬. ব্যক্তিগত ও মনস্তত্ত্বাত্বিক
  • ৭. গতানুগতিক জেন্ডার ভূমিকা

জেন্ডার বৈষম্যের ফলাফল ঘরে ও বাইরে প্রতিনিয়ত প্রকাশ পায়। যেমন, নারী নিরক্ষর বা কম শিক্ষিত হলে অল্প বয়সে বিয়ে হয়, অধিক সন্তান জন্মদান করে। সন্তানদের যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেনা, স্বাস্থ্যহীনতা ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে, সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না। নতুন প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব হয়। ফলে নতুন ও আধুনিক উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে বা কাজকর্মে সংশ্লিষ্ট হতে পারে না। নির্যাতনের স্বীকার হয় এবং প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবে প্রতিবাদ করা বা আইনগত সুবিধা গ্রহণ করতে পারে না।

জেন্ডার বৈষম্য ও শিক্ষার সম্পর্ক

জেন্ডার বৈষম্যের কারণগুলোর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। পুরুষের তুলনায় নারীর অধিক নিরক্ষরতা ও নিম্নমানের শিক্ষার কারণে সে আরও নানা ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি স্বীকার হয়। যেমন:

  • নিরক্ষর ও অশিক্ষিত নারীদের জ্ঞানের অভাব থাকায় তাদের ক্ষমতায়ন হয় না। জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, সমস্যা দূরীভূত ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন নারীর শিক্ষা।
  • নারীর ক্ষমতায়নের অভাব তার আত্বনির্ভরশীলতার প্রধান প্রতিবন্ধকতা। শিক্ষা ব্যক্তিকে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য। এ জন্য তাদের শিক্ষিত হতে হবে।
  • নারীর উন্নয়ন মানেই হচ্ছে তার রাজনৈতিক আর্থিক ও পেশাগত অবস্থার উন্নয়ন ও আইনগত সচেতনতা ইত্যাদি যা শিক্ষার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।
  • নারীর সার্বিক অবস্থার উন্নয়নের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন একজন পুরুষ যদি শিক্ষিত হয় তাহলে কেবল একজন ব্যক্তি শিক্ষিত হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষিত হলে গোটা পরিবার শিক্ষিত হয়। এছাড়া আমাদের নারী সমাজের অনেকেই সামাজিক বাধা নিষেধের কারণে যথাযথ শিক্ষা পায় না, ফলে তাদের, পেশাগত ও ব্যক্তিত্বের যথাযথ বিকাশ সম্ভব হয় না, তাই তারা বৈষম্যের শিকার হয়।

শিক্ষা নারীকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি যোগায়। তাই বাংলাদেশের সংবিধান, জাতীয় শিক্ষানীতিসহ সর্বত্র শিক্ষাক্ষেত্রে নারী পুরুষের বৈষম্য দূর করার উপরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে শিক্ষাক্ষেত্রে নানা পদক্ষেপ (সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, ছাত্রী বৃত্তি চালুকরণ, প্রাথমিক স্তরে ৫০% মহিলা শিক্ষক নিয়োগ ইত্যাদি) গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। শিক্ষার মাধ্যমে নারী যদি তার শিক্ষার অধিকার সঠিকভাবে চর্চা করতে পারে তবে সমাজ থেকে জেন্ডার বৈষম্য নির্মূল করা সম্ভব হবে। শিক্ষাই পারে সমাজের সদস্যদের গতানুগতিক মনোভাব ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিশ্বাস থেকে বের করে এনে একটি সাম্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়তে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ