বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

Accounting: হিসাববিজ্ঞানের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা কী?

সর্বসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের চাহিদা পূরণে বৈচিত্র্যময় উদ্দেশ্যের জন্য হিসাববিজ্ঞানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম

হিসাববিজ্ঞানের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে বলে নেওয়া ভালো যে, প্রতিটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান (Business Organisation) নির্দিষ্ট হিসাবকাল বা অ্যাকাউন্টিং পিরিয়িড (Accounting Period) শেষে তার কারবারের আর্থিক ফলাফল বা আর্থিক বিবরণী (Financial Statements) যেমন জানতে চায়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত বিভিন্ন পক্ষও তাদের স্বার্থ সম্পর্কে জানতে চায়।

তথ্যব্যবস্থা (Information System) হিসেবে হিসাববিজ্ঞানের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষকে তাদের প্রয়োজনীয় ও প্রাসংগিক তথ্য সরবরাহ করে তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা।

যেমন-

  • আর্থিক হিসাববিজ্ঞানের (Financial Accounting) কাজ হলো কারবারের আর্থিক কার্যকলাপের ফলাফল ও অবস্থা সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা।
  • ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞান (Management Accounting) এর কাজ হলো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ব্যবসায় পরিচালনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী তথ্য সরবরাহ করা। 
  • উৎপাদন ব্যয় হিসাববিজ্ঞান (Cost Accounting) এর কাজ হলো পণ্য উৎপাদন ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞান উভয়কে সহায়তা করা।

ব্যবসায় পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার  (management) সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকারী, ঋণদানকারী কর্তৃপক্ষ, পাওনাদার, কর্মচারী ও শ্রমিকসংঘ, ব্যাংক, সরকার, কর কর্তৃপক্ষ ইত্যাদি পক্ষসমূহ বর্তমান অবস্থার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চায়; হিসাববিজ্ঞানের মাধ্যমেই এসব উদ্দেশ্য সাধিত হয়।

হিসাববিজ্ঞানের মোট ১০ টি উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। হিসাববিজ্ঞানের এই ১০ টি উদ্দেশ্যকে দুই ভাগ ভাগ করা যায়, যথা:

  • ১. মৌলিক উদ্দেশ্য
  • ২. সহায়ক উদ্দেশ্য

১. মৌলিক উদ্দেশ্য

নিম্নে হিসাববিজ্ঞানের মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহ বর্ণনা করা হলো:

i. স্থায়ী হিসাব সংরক্ষণ

হিসাববিজ্ঞানের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনগুলোকে স্থায়ীভাবে হিসাবের বহিতে লিপিবদ্ধ করা। যাতে যে-কোনো লেনদেনের তথ্য ও উপাত্ত যে-কোনো সময় অতি সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। জাবেদা (Journal) ও খতিয়ানের (Ledger) মাধ্যমে লেনদেন স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়।

ii. আর্থিক ফলাফল নিরূপণ

একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যকলাপের ফলাফল নিরূপণ করা হিসাবজ্ঞিানের অন্যতম উদ্দেশ্য। 

এইজন্য একটি হিসাবকালের মধ্যে সংঘটিত আয় ও ব্যয় জাতীয় হিসাবের জেরগুলো নিয়ে বিশদ-আয় বিবরণী প্রস্তুত করে যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তার আর্থিক কার্যকলাপের ফলাফল (লাভ ক্ষতি) জানতে পারে।

iii. আর্থিক চিত্র উপস্থাপন

ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থা বা ব্যবসায়ের সম্পদ, দায় ও মালিকানা স্বত্বের পরিমাণগত অবস্থা নিরূপণ করা হিসাববিজ্ঞানের আরেকটি উদ্দেশ্য। এইজন্য একটি হিসাবকালের শেষ তারিখে সম্পদ ও দায়জাতীয় হিসাবগুলোর জের এবং মালিকানা স্বত্বের পরিমাণ নির্ণয় পূর্বক যে আর্থিক অবস্থার বিরণী প্রস্তুত করে যার মাধ্যমে ব্যবসায়ের প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশিত হয় এবং এই আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পক্ষ ভবিষ্যৎ বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

iv. ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা

হিসাববিজ্ঞান হিসাব তথ্যসমূহকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ব্যবস্থাপকগণের চাহিদা অনুযায়ী এমনভাবে উপস্থাপন করে যা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, মূল্য নির্ধারণ, ফলাফল মূল্যায়ন, ব্যবসায়ের ঝুকি বিশ্লেষণ ও অন্যান্য আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

২. সহায়ক উদ্দেশ্য

হিসাববিজ্ঞান মৌলিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যেগুলো সহায়ক উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

সহায়ক উদ্দেশ্যসমূহ নিম্নরুপ:

i. ব্যয় নিয়ন্ত্রণ

প্রতিষ্ঠানের কাঙ্খিত ফলাফল অর্জনে আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যয় (নিয়ন্ত্রণ) করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ ব্যয় হিসাবরক্ষণের মাধ্যমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা হিসাববিজ্ঞানের একটি সহায়ক উদ্দেশ্য।

ii. জাল ও জুয়াচুরি রোধ

হিসাববিজ্ঞান লেনদেন শনাক্তকরণ এবং লেনদেনের স্বপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণাদি সংরক্ষণ সাপেক্ষে লেনদেনগুলোকে হিসাবের বহিতে লিপিবদ্ধ করে জাল, জুয়াচুরি ও প্রতারণা রোধে সহায়তা করে যা ব্যবসায়িক ফলাফল অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যা হিসাববিজ্ঞানের আরেকটি উদ্দেশ্য।

iii. সঠিক দেনা-পাওনার তথ্য প্রদান

ব্যবসায়ের আর্থিক কার্যক্রম সুনামের সহিত মসৃণভাবে পরিচালনার জন্য দরকার সঠিক দেনা পাওনা সংক্রান্ত তথ্য। হিসাববিজ্ঞান সঠিক ভাবে দেনা পাওনার হিসাব রেখে কখন কাকে কি পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে আবার কোন দেনাদারের নিকট থেকে কী পরিমাণ আদায় হবে ইত্যাদি তথ্য প্রদান করা হিসাববিজ্ঞানের আরেকটি সহায়ক উদ্দেশ্য।

iv. নগদান বহি সংরক্ষণ

নগদান বহি সংরক্ষণের মাধ্যমে নগদ আদান প্রদান সংক্রান্ত লেনদেন লিপিবব্ধ করে নগদ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রদান করা হিসাববিজ্ঞানের আরেকটি সহায়ক উদ্দেশ্য।

v. কর নির্ধারণে সহায়তা

সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস কর ও ভ্যাট। হিসাববিজ্ঞান বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন যথাযথ ভাবে লিপিবদ্ধ করে আর্থিক ফলাফল নির্ণয় করে কর নির্ধারণ ও ভ্যাট চলতি হিসাব সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রদেয় ভ্যাট নির্ণয় করা হিসাববিজ্ঞানের উদ্দেশ্য।

vi. আইনগত চাহিদাপূরণ

আধুনিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়। যেমন কোম্পানি আইন, অংশীদারী আইন, শুল্ক আইন, কর অধ্যাদেশ শিল্প আইন, সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অ্যাক্ট (Security and Exchange Act) ইত্যাদি। এ সমস্ত আইনের বিধি বিধান অনুযায়ী হিসাবরক্ষণ ও উপস্থাপন হিসাববিজ্ঞানের অন্যতম উদ্দেশ্য।

শেষকথা

সর্বসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের চাহিদা পূরণে বৈচিত্র্যময় উদ্দেশ্যের জন্যই হিসাববিজ্ঞানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ