বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

Accounting: হিসাববিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

হিসাববিজ্ঞানের নীতিমালা ও প্রয়োগ পদ্ধতিগুলোর সার্বজনীনতা আনয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্যে International Accounting Standards Committee (IASC) নামে একটি সংস্থা গঠিত হয়

বর্তমানে আমরা হিসাববিজ্ঞান বা অ্যাকাউন্টিংয়ের (Accounting) এ রূপ দেখতে পাচ্ছি, তা একদিনে হয়নি। হিসাববিজ্ঞানের উৎপত্তি থেকে আধুনিক সময়ের পর্যায়ে আসতে বিভিন্ন যুগ পার হয়ে আসতে হয়েছে। একটি গতিশীল বিজ্ঞান হিসেবে হিসাববিজ্ঞানের (Accounting) ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতো প্রাচীন। সামাজিক জীব হিসাবে মানুষ একে অপরের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় মানুষের মধ্যে বিনিময় প্রথা সূচিত হয় এবং এই বিনিময়ের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধির সাথে সাথে তা লিখে রাখার প্রয়োজন হয়। সৃষ্টির আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর যেখানেই সভ্যতা বিকাশ লাভ করেছে এবং পণ্য উৎপাদন, বিনিময় ও বন্টন ব্যবস্থা চালু হয়েছে সেখানেই নিজস্ব ধারায় ও বাস্তব প্রয়োগের সুবিধার প্রেক্ষিতেহিসাব লিখন ব্যবস্থার প্রচলন হয়েছে। এই নিবন্ধে হিসাববিজ্ঞানের ইতিহাস তথা উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

হিসাববিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (Origin and Gradual Evolution of Accounting)

হিসাববিজ্ঞানের উৎপত্তির ইতিহাস সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তবে হিসাববিজ্ঞানের উৎপত্তির সঠিক ইতিহাস বের না করতে পারলেও বিজ্ঞানীরা এটি খুব সহজেই অনুমান করেছেন যে, প্রায় চার হাজার বছর পূর্ব হতেই হিসাব লিখন প্রচলন ছিল। প্রাচীন রোম, চীন, ব্যবলনীয়, ভারতীয় ও মিশরীয় সভ্যতায় হিসাবের প্রচলন লক্ষ করা যায়।

হিসাববিজ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা:

  • ১. আদি যুগ বা উম্মেষ পর্ব (Development Period): ১৪৯৪ সাল পর্যন্ত
  • ২. প্রাক বিশ্লেষণ পর্ব (Pre-Explanatory Period): ১৪৯৪ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত
  • ৩. বিশ্লেষণ পর্ব (Explanatory Period): ১৮০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত
  • ৪. আধুনিক পর্ব (Modern Age) :১৯৫০ সালের পরবর্তী

১. আদি যুগ বা উন্মেষ পর্ব (Development Period)

সভ্যতার শুরু হতে ১৪৯৪ সাল পর্যন্ত সময়কালকে আদি যুগ বা উন্মেষ পর্বে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এ সময়ের হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি ও ধরণের উপর ভিত্তি করে এ যুগকে আবার নিম্নোক্ত চার ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রস্তর যুগ (Stone Age)

প্রস্তর যুগে মানুষ বনে জঙ্গলে ও পাহাড়ের গুহায় বসবাস করত। এসময় তারা বনের ফলমূল খেয়ে ও পশু পাখি শিকার করে জীবন ধারণ করত এবং উদ্বৃত্ত খাবার গুহায় সংরক্ষণ করত। তারা গুহার গায়ে অথবা পাথরের গায়ে দাগ কেটে বা ছবি এঁকে সঞ্চিত ফলমূল এবং শিকারের সংখ্যারহিসাব রাখত। মূলত এই গণনা থেকেই হিসাবের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়।

প্রাচীন যুগ (Ancient Age) 

এই যুগে মানুষ ধীরেধীরে গুহা ছেড়ে সমভূমিতে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস আরম্ভ করে। সমাজ বিকাশের সাথে সাথে সামাজিককর্মকাণ্ডে বিবর্তন আসে এবং চাষাবাদও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এই যুগে মানুষ ঘরের দেয়ালে দাগকেটে, রশিতে গিট দিয়ে তাদের উৎপাদিত ফসল ও পশু পাখির হিসাব সংরক্ষণ করত।

বিনিময় যুগ (Exchange Age)

সামাজিক বিবর্তন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বৃদ্ধিও ফলে মানুষ এই যুগে জীবিকা অর্জনের জন্য বিভিন্ন পেশা অবলম্বন করে। ফলে পেশাভিত্তিক জীবিকার সূচনা হয়।

যেমন- কৃষক, জেলে, তাঁতী, কারিগর ও শিকারী ইত্যাদি। কৃষকের প্রয়োজন মাছ ও মাংসের, শিকারীর প্রয়োজন শস্যের ফলে মানুষ একে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং শুরু হয় বিনিময় প্রথা। 

এভাবে বিনিময়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে হিসাবরক্ষণপদ্ধতির অগ্রগতি সাধিত হয়। এসময় মানুষ মাটির দেয়ালে রঙ দিয়ে অথবা কাঠ খোদাই করে বিনিময়ের হিসাব সংরক্ষণ করে।

মুদ্রা যুগ (Money Age)

বিনিময় প্রথায় পণ্য বিনিময়ের অসুবিধা দূর করার জন্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মূদ্রা প্রচলন শুরু হয়। এর ফলে পেশাগত বণিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। ক্রমে ক্রমে বাকীতে ক্রয়-বিক্রয় শুরু হয় এবং দেনা পাওনার হিসাবরক্ষণ শুরু হয়। এসময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মানুষ নিজ নিজ ধারণা অনুযায়ী বিভিন্ন পদ্ধতিতে হিসাবরক্ষণ করে যা ছিল অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যাকে বর্তমানে একতরফা দাখিলা পদ্ধতি বলাহয়।

২. প্রাক-বিশ্লেষণ পর্ব (Pre-Explanatory Period)

১৪৯৪ সাল হতে ১৮০০ সাল পর্যন্ত সময় কালকে প্রাক-বিশ্লেষণ কাল ধরা হয়। চতুর্দশ শতাব্দির প্রথম দিকে ইটালির জেনোয়া বন্দরকে ঘিরে ব্যবসা বাণিজ্য ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ফলে জটিল লেনদেনসমূহের যথাযথ নীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী হিসাবরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। অবশেষে ১৪৯৪ সালে ইতালির ধর্মযাজক ও গণিত শাস্ত্রবিদ লুকা প্যাসিওলি (Luca Pacioli) তার “Summa de arithmetica, geometria, proportionie et proportionalite”নামক যুগান্তকারী গ্রন্থে সর্বপ্রথম ব্যবসায়িক লেনদেন লিপিবব্ধকরণের ক্ষেত্রে, লেনদেনের ডেবিট ও ক্রেডিট নির্ণয়ের সোনালী সূত্রের উল্লেখ করেন। যার উপর ভিত্তি করে হিসাবরক্ষণের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হিসেবে হিসাববিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়। আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের জনক লুকা প্যাসিওলি।

৩. বিশ্লেষণ পর্ব (Explanatory Period)

১৮০০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময় কালকে বিশ্লেষণ পর্ব ধরা হয়। এই সময়ে বৃহদায়তন উৎপাদন, উৎপাদন 

ব্যবস্থা কারখানায় স্থানান্তর, যৌথ মূলধনী কারবারের আবির্ভাব, মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথকীকরণ, মালিক শ্রমিক সম্পর্কে জটিলতা, প্রতিযোগিতা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও অধিক মুনাফা অর্জনের আকাঙ্খা ইত্যাদি কারণে হিসাব ব্যবস্থায় নতুন নতুন সমস্যা দেখাদেয় এবং নানা জটিলতার উদ্ভব হয়। ফলে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য হিসাবরক্ষণ সংক্রান্ত গবেষণা শুরু হয় এবং নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার হয়। মূলত আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের যাত্রা এখান থেকেই শুরু হয়।

৪. আধুনিক পর্ব (Modern Age)

বিংশ শতাব্দীতে মানব সভ্যতার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে হিসাববিজ্ঞানের আওতা ও কার্যকলাপ সম্প্রসারিত হয়। যুগের চাহিদা অনুযায়ী হিসাববিজ্ঞান বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়।

যেমন: আর্থিক হিসাববিজ্ঞান, উৎপাদনব্যয় হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞান, আয়কর নির্ধারণ হিসাব, নিরীক্ষা হিসাববিদ্যা, সামাজিক হিসাব ও বাজেট সংক্রান্ত হিসাবের সৃষ্টি হয়েছে।

আধুনিককালে কম্পিউটার আবিষ্কারের ফলে কম্পিউটার চালিত Accounting Software এর মাধ্যমে পরিচালিত হিসাব ব্যবস্থা অনেক সহজ ও সময় সাশ্রয়ী হয়েছে এবং হিসাববিজ্ঞানকে তথ্য ব্যবস্থা (Information System) নামে অভিহিত করা হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে, হিসাববিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্রমবিকাশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতেই থাকবে।হিসাববিজ্ঞান পদ্ধতিকে যুগ উপযোগী করার লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিগণ, বিভিন্ন সংস্থা ও গবেষকগণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।হিসাববিজ্ঞানের নীতিমালা ও প্রয়োগ পদ্ধতিগুলোর সার্বজনীনতা আনয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্যে International Accounting Standards Committee (IASC) নামে একটি সংস্থা গঠিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশও এর সদস্য। এই সংস্থা হিসাববিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নীতি নির্ধারণ করে এর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ