বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

পরিকল্পনা কী? পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য, লক্ষ্য ও ব্যবস্থাপনার সাথে পরিকল্পনার সম্পর্ক কী?

আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক হেনরি ফেয়ল সর্বপ্রথম পরিকল্পনাকে ব্যবস্থাপনার একটি স্বতন্ত্র কার্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন

ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার মৌলিক কার্যাবলির মধ্যে পরিকল্পনা হচ্ছে প্রথম ও মুখ্য কাজ। এটি একটি বিশেষ ধরনের সিদ্ধান্ত যা সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কীত। শুধু ব্যবসায় জগতেই নয়, পরিকল্পনা বিষয়টি সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ব্যবসায় জগতে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা হচ্ছে লক্ষ্যভিত্তিক অগ্রযাত্রার পথিকৃত।

পরিকল্পনার ধারণা (Concept of Planning)

পরিকল্পনা হলো ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের অগ্রিম সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি প্রক্রিয়া। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোন কাজ কখন, কীভাবে, কার দ্বারা সম্পাদন করা হবে, এসব বিষয়ের পূর্ব-নির্ধারিত কর্মসূচিকে পরিকল্পনা বলে। 

পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার প্রথম ও প্রধান ধাপ। এটি ভবিষ্যৎ কার্যের একটি নক্সা বা প্রতিচ্ছবি। পূর্ব এবং বর্তমান অভিজ্ঞতা, পরিসংখ্যানিক তথ্যাদি এবং যু্িক্তসঙ্গত কারণের উপর ভিত্তি করেই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ ইতোপূর্বে কী ঘটেছে, কীরূপে ঘটেছে, কখন ঘটেছে এবং কতটুকু সুফলতা অর্জিত হয়েছে, তার উপর ভিত্তি করেই পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়। পরিকল্পনায় প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন বিকল্প কর্মপন্থা থেকে উত্তম কর্মপন্থাটি বেছে নেওয়া হয়। 

পরিকল্পনা প্রক্রিয়াটি নিম্নোক্তভাবে দেখানো যায়: 

উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নির্ধারণ করা → বিকল্প কর্মপন্থা নির্ধারণ → সর্বোত্তম কর্মপন্থা বাছাই → লক্ষ্য অর্জন 

বিভিন্ন পণ্ডিত ও গবেষকের মতে পরিকল্পনার সংজ্ঞা

  • এইচ. অইরিচ ও এইচ. কুঞ্জ (H. Weihrich and H. Koontz) এর মতে, ‘ব্রত ও লক্ষ্য নির্বাচন এবং এগুলো অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের সাথে পরিকল্পনা জড়িত; এর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অর্থাৎ বিকল্প কর্মপন্থা হতে উত্তম কর্মপন্থা নির্বাচন’ (Planning involves selecting missions and objectives and the actions to achieve them; it requires decision making, that is, choosing future courses of action among alternatives)।
  • ডাব্লিউ.এইচ. নিউম্যান (W. H. Newman)- এর মতে, ‘কী করা হবে সে বিষয়ে অগ্রিম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকে পরিকল্পনা বলে’ (Planning is deciding in advance what is to be done)।
  • আর. এন. ফার্মার ও ব্যারি এম. রিচম্যান (R. N. Farmer & Barry M. Richman)-এর মতে, ‘সাংগঠনিক কোনোকাজের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে পরিকল্পনা বলে’ (The planning is the process of making decision for any phase of organisational activity)।
  • ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ L. A. Allen বলেন, “Plan is the trap to capture the future” অর্থাৎ “পরিকল্পনা হলো ভবিষ্যতকে আবদ্ধ করার একটি ফাঁদ”।

উপরের সংজ্ঞাসমূহের আলোকে আমরা বলতে পারি যে, প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ভবিষ্যতে কোনোকাজ কখন, কার বা কাদের মাধ্যমে, কীভাবে সম্পাদিত হবে এ সম্পর্কে পূর্বঅভিজ্ঞতা ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গৃহীত কার্যসূচি প্রণয়নের প্রক্রিয়াই হলো পরিকল্পনা। 

পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য (Features/Characteristics of Planning)

পরিকল্পনা হলো ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের পূর্ব-নির্ধারিত কার্যসূচি। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যে সব কাজ সম্পাদন করা হবে তা কখন, কীভাবে, কার মাধ্যমে সম্পাদিত হবে এ সব বিষয়ের আগাম সিদ্ধান্তই পরিকল্পনা।

পরিকল্পনার কতকগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো নিচে আলোচনা করা হল:

১. অগ্রিম সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Taking advance decision)

একজন ব্যবস্থাপক কী কাজ করবেন, কীভাবে করবেন, কখন করবেন এবং কাকে দিয়ে করাবেন- এসব বিষয়ে পরিকল্পনাকালে অগ্রিম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে কার্য পরিচালনার সময় যাতে অনাকাঙ্খিত সমস্যার সৃষ্টি না হয় সেজন্য ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্পর্কে অগ্রিম সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন। 

২. ভবিষ্যৎ কর্মসূচি প্রণয়ন (Formulating future programmes)

পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ কর্মসূচির একটি নক্সা প্রণয়নের প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে কোনোবিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন প্রকার বিকল্প কর্মপন্থা নিরূপণ করা হয় এবং সেগুলো থেকে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা বাছাই করে বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। 

৩. মানসিক প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি (Creating mental portrait)

পরিকল্পনা একটি প্রতিষ্ঠানে বা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সংশ্লিষ্ট বিভাগে ভবিষ্যতের কর্মপন্থাসমূহের একটি মানসিক কাঠামো সম্পর্কে সুস্পষ্ট আভাস দেয়। 

৪. অতীত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন (Reflection of past experience)

সাধারণত পরিকল্পনা করার সময় পূর্বের অভিজ্ঞতার বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন ব্যবস্থাপক যখন প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করেন তখন তিনি অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। অতীতের অর্জিত ফলাফল বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। 

৫. লক্ষ্য অর্জন (Achieving goal)

পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের একটি সুসংবদ্ধ প্রচেষ্টা। যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা প্রণীত হয়। তাই পরিকল্পনা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম করে। 

৬. অনিশ্চয়তা মোকাবেলা (Facing uncertainty)

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের একটি প্রধান লক্ষ্য থাকে। এটি অর্জনের জন্য অনেকগুলো সহায়ক উপ-লক্ষ্য (sub-gola) সৃষ্টি করা হয়। এসব উপ-লক্ষ্য অর্জন করার পথে বহুবিধ অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। অর্থাৎ অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। পরিকল্পনা প্রণয়নকালে এসব উপাদান বিবেচনায় রাখা হয়। 

৭. ব্যাপকতা (Comprehensiveness)

প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক বিভাগ ও সেকশনের জন্য আলাদা আলাদাভাবে পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজন হয় বলে পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরে প্রভাব বিস্তার করে। 

৮. পরিবর্তনশীল (Flexibility)

উদ্ভূত পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার ব্যবস্থা রাখা হয়। নমনীয়তা উৎকৃষ্ট পরিকল্পনার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। কোনোপ্রতিষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হলে উপরে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতি দৃষ্টি রাখতে হয়। জানা হলো পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য। 

পরিকল্পনার লক্ষ্য (Goals in Planning)

পরিকল্পনার প্রত্যাশিত ফলকে লক্ষ্য বলে। আমরা জানি যে, একটি প্রতিষ্ঠান কিছু কাঙ্ক্ষিত ফল পাবার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এটা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠান মানবীয় ও অ-মানবীয় সকল প্রকার উপাদানগুলো কাজে লাগায়। লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। তাই লক্ষ্য ব্যবস্থাপনা কার্যাবলীর কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। এ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড কীভাবে, কখন এবং কার দ্বারা সম্পাদন করা হবে সে জন্য পরিকল্পনা করতে হয়। H. W. Newman এর ভাষায়, লক্ষ্য প্রশাসনের নানাবিধ উদ্দেশ্য অর্জনে কাজ করে।অর্জনযোগ্য ফলাফলের বর্ণনাই লক্ষ্য (Plans expressed as a result to be achieved may be called goals)।

লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের কাঙ্খিত ফল বা প্রান্তিক ফল যা একটি প্রতিষ্ঠান অর্জন করতে চায়। লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা ও কৌশলই হলো পরিকল্পনা।

ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কার্যাবলির সাথে পরিকল্পনার সম্পর্ক (Relationship between Planning and Other Functions of Management)

ব্যবস্থাপনা বহুবিধ কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে। তন্মেধ্যে প্রধান প্রধান কাজ হচ্ছে- পরিকল্পনা, সংগঠন, কর্মীসংস্থান, নির্দেশনা, প্রেষণা, যোগাযোগ, সমন্বয়সাধান ও নিয়ন্ত্রণ। ‘পরিকল্পনা’ কার্য দিয়ে ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং সমাপ্তি ঘটে ‘নিয়ন্ত্রণ’-এর মধ্য দিয়ে। ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াকে যদি আমরা একট সড়কের সাথে তুলনা করি, তাহলে পরিকল্পনা হলো সড়কের প্রথম প্রান্ত (যাত্রা শুরুর স্থান) এবং নিয়ন্ত্রণ হল শেষ প্রান্ত (গন্তব্যস্থল)। এ দু’য়ের মাঝখানে অন্যান্য কার্যাবলির অবস্থান। পরিকল্পনা ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে; আর নিয়ন্ত্রণের চোখ থাকে অতীতের প্রতি। পরিকল্পনায় যা করার জন্য প্রস্তাব করা হয়, বাস্তবায়ন শেষে নিয়ন্ত্রণ তা মূল্যায়ন করে। মাঝখানের কাজগুলো পরিকল্পনার বাস্তবায়নে সহায়তা করে। অথবা বলা যায়, পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করে লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্যান্য কাজগুলো পরিচালিত হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, পরিকল্পনার সাথে অন্যান্য ব্যবস্থাপকীয় কার্যাবলির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। সবগুলো কাজই পরিকল্পনার উপর নির্ভরশীল।

সারকথা

ব্যবস্থাপনা কার্যাবলীর ভেতর পরিকল্পনা হচ্ছে সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান কাজ। পরিকল্পনা হচ্ছে ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কার্যাবলীর ভিত্তিস্বরূপ। আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক হেনরি ফেয়ল সর্বপ্রথম পরিকল্পনাকে ব্যবস্থাপনার একটি স্বতন্ত্র কার্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। পরিকল্পনা একটি প্রক্রিয়া যা কোনো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য স্থির করে এবং ঐ লক্ষ্য অর্জনের  জন্য ভবিষ্যতে করণীয় সবচেয়ে সম্ভাব্য উপযুক্ত কর্মসূচি প্রণয়ন করে। অধ্যাপক হ্যারল্ড কুঞ্জ পরিকল্পনার মোট আটটি ধাপ বর্ণনা করেছেন। পরিকল্পনার ধাপসমূহ সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার মাধ্যমে আরম্ভ হয় এবং বাজেট করার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ