শনিবার, অক্টোবর ১, ২০২২

ভগিরথ চন্দ্র সেন আমার প্রিয় শিক্ষক

অবসরের আগ পর্যন্ত স্যার আরো অনেক শিক্ষার্থীদেরই সাহায্য-সহযোগীতা করে গেছেন। প্রয়োজনে তিনি শিক্ষার্থীদের বাড়িতে চাল পৌঁছে দিয়েছেন, এমনও শুনেছি।

শিক্ষা দানের মহান ব্রত যারা পালন করেন তাদেরই আমরা শিক্ষক হিসেবে জানি। শিক্ষকতা এমন একটি পেশা যার সাথে পরিচিত আমরা সবাই এবং আমাদের প্রত্যেকের কাছেই বিশেষভাবে মর্যাদার। এ মহান পেশায় এসে নিজেদের সম্মানিত করার পাশাপাশি সর্বোচ্চটা দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন বা এখনও করছেন, ভবিষ্যতেও আসবেন অনেকে। কিন্তু খুব অল্প সংখ্যকই আছেন যারা নিজেদের দায়িত্ব পালনের চেয়েও অনেক বড় কিছু করে গেছেন, আজ এমনই একজনের কথা বলব।

ভগিরথ চন্দ্র সেন। ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক; মানুষ গড়ার কারিগর বলা যেতে পারে। নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলাধীন ছয়ধরিয়া গ্রামের এই কৃতি শিক্ষক ১৯৭২ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ভাগদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্ম জীবন শেষ করেন রাবান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। চাকরিতে যোগ দেয়ার পর থেকে দীর্ঘ্য ৩৫ বছর প্রত্যহ সাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে যোগ দিতেন। নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন পেশাদারিত্বের শেষ দিন পর্যন্ত যেন তাঁর কোন রকমের ক্লান্তি ছিলনা। ২০০৭ এ এসে অবসর নেয়ার পরেও গ্রামে শিক্ষামূলক ও সামাজিক নানা কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন।

মানুষ গড়ার এ কারিগর গত বছর ৩০শে ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে পরলোক গমণ করেন। তাঁর বিদায়ের সাথে সাথে একজন ভাল শিক্ষক ও ভালো মানুষ কমে গেলো দেশ থেকে। একজন ভালো মানুষ ও একজন ভাল শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রী ও চারপাশের মানুষের জন্য অনেক করেছেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩/৭৪ সালের কথা কথা বলছি। তখন আমি প্রাথমিকের শিক্ষার্থী ছিলাম। চারদিকে ছিল দারিদ্র্যের ছড়াছড়ি। আপনারা হয়তো জানেন বা জেনে থাকবেন ১৯৭৪ এর দূর্ভিক্ষের কথা। প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ ও পরিবারের উপড় যার নেতিবাচক প্রভাব পরেছিল। আমি ছিলাম স্বল্প আয়ের কৃষক পরিবারের একজন সদস্য। আমার কিছু সহপাঠী ছিল যারা ছিল অতি দরিদ্র পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আমার এ বন্ধুরা অনেক সময় সকালে না খেয়েই বিদ্যালয়ে আসতো বা আসতে বাধ্য হত। আমাদের ভগিরথ স্যার প্রায়ই তাদেরকে অল্প করে হলেও পাশের দোকান থেকে বিস্কুট কিনে খাওয়ার জন্য পয়সা দিতেন; এমনকি কখনও খাতা-কলমও কিনে দিতেন। তৎকালীন সরকার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের খাওয়ার জন্য গুড়া দুধ ও ছাতু/গম সরবরাহ করত, আজকে যাকে আমরা মিড ডে মিল বলি। গুড়া দুধকে আমরা বলতাম ‘বিলেতি দুধ’ আর ছাতুকে বলতাম ‘ভুট্টার গুড়া’। মাঝে মাঝে বিস্কুটও দেয়া হত আমাদের। এই ভূট্টারগুড়া বা বিস্কুট ছিল কিছু শিক্ষার্থীদের জন্য সারাদিনের খাবার। আমার মনে আছে, সকালের খাবারে আমরা তরল খিচুরি ও জাউ ভাতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কেবল দুপুর এবং রাতে জুটতো ডাল-ভাত। অবশ্য বাড়ির আনাচে কানাচে খুঁজে কিছু শাক-সবজিও মেলানো যেত। ভগিরথ স্যার ওই সময় শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রেখেছিলেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী।

আমার ও আমার বন্ধুদের জীবনে প্রভাব ফেলতে পেরেছেন যে কয়জন শিক্ষক, ভগিরথ স্যার তাদের মধ্যে অন্যতম। আমাকে শিক্ষাদান ও যথাযথ নির্দেশনা দানের জন্য আমি আমার সকল শিক্ষকের নিকটই ঋণী কিন্তু একটু বেশি ঋণ বোধ করছি ভগিরথ স্যারের কাছে। তাঁর ভালবাসা বা আদর-যত্ন ছাড়া সেই ছোট্ট ছেলে-মেয়েগুলো আজ এতটা বড় হতে পারত না। কারণ প্রতিটি মূহূর্তকেই আমরা ঝরে পরার ক্ষণ মনে করতাম।

আমাদের ভগিরথ স্যারের আর্থিক দিকটি অন্যদের তুলনায় ভালই ছিল এবং নিয়মিতই শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতেন। স্যারের কাছ থেকে আমাদের সহপাঠী আরমান খাবার এবং অন্যান্য সহযোগিতা একটু বেশিই পেত কিন্তু সে দারিদ্র্যের সাথে বেশিদিন লড়াই করতে পারেনি। বিদ্যালয় বাদ দিয়ে ক্ষেতে খামারে যাওয়া শুরু করল। কৃষি কাজ হয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। এখন সে অনেকগুলো শিশুর দাদা, নানা হয়ে তাদের সাথে দিন কাটাচ্ছে। তাকে দেখলে মনে হয় ৮০-৮৫ বছরের বৃদ্ধ। তবে যারা নিজেদেরকে সংগ্রামের সাথে মানিয়ে নিতে পেরেছিল তারা খুব ভাল অবস্থানে আছে। বলছিনা আরমান খুব খারাপ অবস্থানে আছে, ভাগ্য বলেও একটি কথা আছে।

অবসরের আগ পর্যন্ত স্যার আরো অনেক শিক্ষার্থীদেরই সাহায্য-সহযোগীতা করে গেছেন। প্রয়োজনে তিনি শিক্ষার্থীদের বাড়িতে চাল পৌঁছে দিয়েছেন, এমনও শুনেছি। প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষার সময় অনুদান এর পরিমান বৃদ্ধি পেত। এমন একজন ছাত্রদরদি মহান শিক্ষকের সান্নিধ্যে পড়ালেখার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি। আজ নিজে শিক্ষক হয়ে বুজতে পারছি তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। আজকের সমাজে তার মত উদার শিক্ষকের কতটা প্রয়োজন তা আমরা খুবই টের পাচ্ছি। অবসরের পরেও তিনি সমাজের উন্নয়নের সাথে জড়িত ছিলেন। অন্যদের সাথে নিয়ে একটি কিন্ডার গারটেন স্থাপন করে এর সাথে যুক্ত ছিলেন।

তার এ প্রয়ান দিবসে তাকে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা জানানো ছাড়া আর কিইবা করার আছে। ওপারে ভাল থাকবেন স্যার। আমরা যেন আপনার আদর্শের কিছুটা হলেও আমাদের কাজে কর্মে প্রতিফলন ঘটাতে পারি।

(লেখাটি মহান শিক্ষক ভগিরথ চন্দ্র সেনের স্মরণে তাঁর প্রয়ান দিবস (ডিসেম্বর ৩০) উপলক্ষে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন লেখক)

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

ড. রঞ্জিত পোদ্দার
সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকায় সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি একাধারে শিক্ষক, শিক্ষক প্রশিক্ষক, শিক্ষা গবেষক এবং ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার নিয়মিত প্রাবন্ধিক।

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।