সফল উদ্যোক্তা হাজী মোহাম্মাদ জুনাব আলী সাহেবে-এর জীবন ভিত্তিক কেস স্টাডি

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লা জেলার অর্ন্তগত নিমসার গ্রামে জুনাব আলী জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ চারু মিয়া ছিলেন একজন সাধারণ ধর্মপরায়ণ কৃষক। জমিজমা বলতে কিছুই ছিলনা। অধিকাংশ সময় সংসার খরচের জন্য নিকট আত্মীয়স্বজনদের কাছে সাহায্যের জন্য ধরনা দিতে হতো। এভাবে আর্থিক অনটনের মধ্যে জীবনযাপনের একসময় শেখ চারু মিয়া ১৯৪৪ সালে ৮২ বছর বয়সে তাঁর নিজ গ্রামে ইন্তিকাল করেন। 

শিক্ষাজীবন

হাজি জুনাব আলীর কর্মজীবনের কাহিনী অন্যান্য ব্যবসায়ীর জীবন বৃত্তান্ত থেকে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকের। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের মক্তবে। এক বছর পর তিনি যখন প্রথম থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উর্ত্তীন হন, তখন পিতার নিকট নতুন বই কেনার জন্য কিছু টাকা চান। কিন্তু তাঁর পিতা টাকা না দিতে পারায় ঘরে চাল যা ছিল সব বিক্রি করে এক টাকা ৫৬ পয়সা পেলেন এবং তা নিয়েই বাড়ী ত্যাগ করলেন এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন যে পর্যন্তু নিজে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারবেন এবং বাবা-মার ভরন পোষণের ব্যবস্থা করতে না পারবেন সে পর্যন্তু বাড়ি ফিরবেন না। সেই এক টাকা ৫৬ পয়সাই ছিল তাঁর বাস্তব জীবনের সোপান। 

ঘটনাবহুল ব্যবসায়িক জীবন

এক টাকা ৫৬ পয়সা দিয়ে তিনি তরিতরকারী বিক্রয় করতে শুরু করেন। সুদীর্ঘ বারো বছর তিনি এ ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। এ ব্যবসায় থেকেই ক্রমান্বয়ে সঞ্চিত মুলধন তিন হাজার উন্নিত করলেন এবং তা দিয়ে কুমিল্লা জেলার পশ্চিমে ময়নামতি বাজারে একটি বড়ো আকারের মনিহারি দোকান দিলেন।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঘাঁটি ছিল ময়নামতি। জুনাব আলী যুদ্ধ চলাকালিন সেনা নিবাসে নিয়মিত চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি সরবরাহের কন্ট্রাক্ট পান এবং তা থেকে প্রায় বিশ হাজার টাকা উপার্জন করেন। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ যখন শেষপর্যায়ে সেই সময় তিনি এ টাকা দিয়ে কুমিল্লা শহরের ব্যস্ততম এলাকা শাসনগাছায় একটি বড়ো আকারের মনিহারি দোকান দেন। শাসনগাছায় তখন মাত্র দুটি দোকান থাকার কারণে তার ব্যবসায় ছিল খুবই জমজমাট। 

কিছুদিন পর তিনি দোকান থেকে মুলধন উঠিয়ে কুমিল্লা দাউদকান্দি রুটে ‘সোনার বাংলা’ এবং ‘গ্রীন এ্যারো’ নামক বিশ হাজার টাকা মূল্যের দুটি বাস চালু করেন। একাধিক পণ্য নিয়ে ব্যবসায় পরিচালনা করলে স্থায়ী ব্যয় কম হবে ভেবে তিনি ১৯৫০ সালে তাঁর শামনগাছায় দোকানের নামে তৎকালীন পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানির কুমিল্লা জেলার একমাত্র পরিবেশক হন। ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায় লাভজনক ছিল বলে তিনি এ ব্যবসায়েও মূলধন নিয়োগ করেন এবং প্রায় প্রতি বছরই দু একটি করে বাস বা ট্রাক ক্রয় করতেন এ ব্যবসায়ের প্রয়োজনীয় মুলধনের ৩০% তিনি জনতা ব্যাংক থেকে গ্রহন করতেন। 

এ সময়ে তিনি কুমিল্লা শহরের আবাসিক এলাকা অশোকতলা এবং কান্দিরপাড়ে দুটি হিন্দু জমিদারের বাড়ি ক্রয় করেন। তাছাড়া ১৯৪৭ সালে অনেক হিন্দুই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় জুনাব আলী তাদের জমি ধন সম্পত্তি ক্রয় করে সম্পদশালী হন। জুনাব আলী নিজে রেইস কোর্স এলাকায় একটি খালি জায়গা ক্রয় করে বাড়ি করেন। এ সময় এ জমিতে তাঁর ট্রান্সপোর্টের তত্ত্বাবধানের জন্য পুত্র নুরল ইসলামের নামে নুর ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কসপ স্থাপন করেন। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত— তার মোট বাস সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০টিতে এবং এ ব্যবসায় তাঁর প্রায় দুশো শ্রমিক নিয়োজিত ছিল।

ইতোমধ্যে গ্রামের রাজনীতিতে জুনাব আলী ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তৎকালীন কৃষক-শ্রমিক আওয়ামীলীগের তিনি একজন সমর্থক থাকায় জুনাব আলী স্থানীয় প্রতি নির্বাচনেই জয়লাভ করতেন এবং প্রায় একটানা ৩০ বছর যাবৎ ইউনিয়ন বোর্ডের কখনও মেম্বার বা কখনো প্রেসিডেন্ট ছিলেন। রাজনৈতিক কারণেই ১৯৫৮ সালে তাঁকে নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয় এবং সাত দিন কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬২ সালে জুনাব আলী খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে আলুর বীজ আমদানির একটি লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। আমদানি ব্যবসায় শুরুর পর থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে মূলধন প্রায় ২৫/৩০ লাখ টাকায় উন্নীত করেন। ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্তু তিনি খাদ্য মন্ত্রনালয়ের অধীনে খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার নিযুক্ত ছিলেন। আবার এসময়ে চট্রগ্রাম বিভাগের পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানির ঠিকাদারও ছিলেন তিনি। চট্রগ্রাম থাকাকালীন ১৯৬৮ সালে ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদে এক বিঘার একটি খালি জায়গা ক্রয় করেন এবং ব্যবসায়িক কাজকর্মের সুবিধার জন্য সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। বার্মা ইর্স্টাণের এজেন্সি নিয়ে ১৯৭০ সালে ঢাকা-চট্রগ্রাম সড়কের পাশে ময়নামতিতে ৫ বিঘা জমির উপর ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পেট্রোল পাম্প স্থাপন করেন। হাজি জুনাব আলী ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শহর ছেড়ে নিজ গ্রামে ফিরে যান এবং সেখানে ১ বছর সময় অতিবাহিত করেন।

যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর প্রায় ২০/৩০টি বাস ট্রাক ধ্বংস করে। বাকি বাস ও ট্রাক তাঁর কেন্দ্রিয় ওয়ার্কশপে বন্ধ রেখে তিনি সে সময়ে গ্রামের জমিজমার দিকে মনোনিবেশ করেন এবং অল্প সময়ের ভেতরে চাষের উপযোগী জমির পরিমান বৃদ্ধি করেন। সরকার ১৯৭২ সালে আলু আমদানি সরকারি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জুনাব আলী ১৯৭২ সালে জানুয়ারি মাসে আলু গুদামজাত করার জন্য পঞ্চাশ হাজার মণ আলু রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি হিমাগার স্থাপন করেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় জুনাব আলী সুযোগ বুঝে বহু নতুন ব্যবসায় বা শিল্প বিনিয়োগ করেছেন এবং অলাভজনক মনে হলে পুরাতন কাজ ধীরে ধীরে পরিত্যাগ করেছেন। বেতকা হিমাগার শিল্পে মোট ব্যয় হয় ২০ লাখ টাকা, তাঁর নিজস্ব বিনিয়োগ ৬ লাখ টাকা এবং ১৪ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। জনাব আলী ১৯৭৪ সালে মুন্সিগঞ্জের কমলাঘাট ‘প্রজেক্ট’ ট্রেডিং স্টোরেজ লিমিটেডের শতকরা ৬০ ভাগ শেয়ার ক্রয় করেন এবং নগদ ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। এছাড়া জুনাব আলী ১৯৭৬ সালে কুমিলশা শহর থেকে দক্ষিন-র্পুব কোণে শামস কোল্ড স্টোরেজ লিঃ এর শতকরা ৫০ ভাগ শেয়ার ১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে ক্রয় করেন। ব্যাংকের সহায়তায় আবার ১৯৭৮ সালে মুন্সিগঞ্জের বেতকায় জামাল আইস এন্ড কোল্ড সোটারেজ লিঃ এ ৩৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। এর দুই তৃতীয়াংশ অর্থ জুনাব আলীর ছিল। কুমিল্লা শহরের সাত মাইল পশ্চিমে কাবিলী নামক স্থানে -একটি ব্রিকফিল্ডও স্থাপন করেন। ব্রিকফিল্ড ইট মূলত তাঁর নিজের র্নিমাণ কাজেই ব্যবহার করা হয়।

তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকার মালিবাগে ৫ কাঠা জমির উপর একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। জনাব জুনাব আলী মালিবাগ ডি আই টি রোডের পাশে ৮ কাঠা জমির উপর স মিলস স্থাপন করে কাঠের ব্যবসায় শুরু করেন। এছাড়া ১৯৭৫ সালে ঢাকার খিলগাঁয়ে চার কাঠার একখন্ড জমি ক্রয় করেন। জুনাব আলী আরও একটি হিমাগার ১৯৮০ সালে কুমিল্লা শহর থেকে ৮ মাইল পশ্চিমে মোকাস নামক স্থানে ১ লাখ মণ আলু রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ‘মোকাস স্টোরেজ লিঃ’ নামে প্রতিষ্টা করেন। বিভিন্ন হিমাগারে ১০০ জন লোকের কর্মসংস্থান হয় এবং এখানে তাঁর নিজস্ব বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। বাঁকি ৫০ লাখ টাকা তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেন এবং প্রধান ব্যবসায়িক হিসেবে সাফল্য মূলত হিমাগার স্থাপনের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।

(ওপেন স্কুল, বাউবি পাঠ্যবই থেকে সংকলিত)

এ বিষয়ের আরও নিবন্ধ

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বলতে কী বোঝায়

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (Human Resource management) হলো একই সঙ্গে একটি অধ্যয়নের বিষয় ও ব্যবস্থাপনা কৌশল যা একটি প্রতিষ্ঠানের...

ডিজিটাল লোন: ডিজিটাল লোন অ্যাপ কী এবং এর সুবিধা ও অসুবিধা

কার অর্থের প্রয়োজন নেই? মাঝেমধ্যেই আমাদের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার কারণে প্রায়শই বিভিন্ন খাতে খরচ করতে হয়। সব সময় যে...

প্রশাসন এবং ব্যবস্থাপনার ধারণা, পরিসর ও পার্থক্য

কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নীতি প্রণয়ন করা প্রশাসনের কাজ এবং সে নীতিগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা দেখাশোনা ও তদারকি করার দায়িত্ব...

Banking: বাংলাদেশে কি টাকার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি?

ব্যাংকিং খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয়। ব্যাংকের অন্যতম কাজ হলো দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার চাকা সচল রাখতে ঋণ দেয়া এবং সময়মতো সে...
আরও পড়তে পারেন

টপ্পা গান কী, টপ্পা গানের উৎপত্তি, বাংলায় টপ্পা গান ও এর বিশেষত্ব

টপ্পা গান এক ধরনের লোকিক গান বা লোকগীতি যা ভারত ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। এই টপ্পা গান বলতে...

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলতে কী বোঝায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখাবিশেষ যেখানে পরিচালন প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতি সম্পর্কীয় বিষয়াবলী নিয়ে আলোকপাত করা হয়।  এরিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে রাষ্ট্র...

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কী বা গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়

গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের অথবা কোনো সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বা পরিচালনাব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক...

সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, অসুবিধা ও অর্থনীতি

সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল ১৯১৭ সালে। সমাজতন্ত্রে বৈরি শ্রেণি নেই, কেননা কলকারখানা, ভূমি, সবই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সমাজতন্ত্রে শ্রেণি...

জীবনী: সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ছিলেন একজন বাঙালি লেখক ও কবি। তিনি উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রবক্তাদের একজন। সিরাজী মুসলিমদের...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here