বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী?

ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ম্যানেজমেন্ট (Management)। Management-এর অর্থ হলো ‘to handle’, যার বাংলা করলে হয় ‘চালনা করা’ বা ‘পরিচালনা করা’। Management শব্দটি ইতালিয়ান শব্দ Maneggiare থেকে এসেছে। এখানে Mangeggiare  অর্থ হলো to train up the horse। আবার অনেকের মতে Management শব্দটি এসেছে ফ্রেন্স Maneger শব্দ থেকে, যার অর্থ হলো- direct a household; to economize an act of guiding or leading।

ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজমেন্ট (Management) হলো কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এক বা একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত সকল মানবীয় ও বস্তুগত উপাদান ও উপকরণের কার্যকর ব্যবহারের একটি ধারাবাহিক ও প্রত্যাশিত সামাজিক প্রক্রিয়া। ব্যবস্থাপনাকে একটি মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সক্রেটিস বলেছেন ব্যবস্থাপনা সার্বজনীন।

আধুনিক ব্যবস্থাপনার নীতির প্রবক্তা ও জনক হেনরি ফেয়ল

ব্যবস্থাপনার নীতিমালা

ব্যবস্থাপনা নীতিমালা হচ্ছে ব্যবস্থাপকীয় কার্যাবলী সুষ্ঠুভবে সম্পাদনের নির্দেশিকা স্বরূপ। কেউ যদি প্রশ্ন করে বা জানতে চায় যে, ব্যবস্থাপনা কোন কোন নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বা ব্যবস্থাপনার মূলনীতি কী কী। এরকম প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেওয়া সব সময়ই কঠিন যেহেতু আজ পর্যন্ত এর কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম-নীতি নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। তবে আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক হেনরি ফেয়ল (Henry Fayol) ১৯১৬ সালে ফ্রান্সে তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ জেনারেল অ্যান্ড ইনডাসট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট  (General and Industrial Management) এ ১৪টি ব্যবস্থাপনা নীতি প্রদান করেছেন; এই নীতিগুলোই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও  গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হিসেবে মানা হয়।

নিচে হেনরি ফেয়লের ব্যবস্থাপনার ১৪ টি নীতি আলোচনা করা হলো:

১. কার্যবিভাগ (Division of work)

কার্যবিভাগ নীতি প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ব্যবস্থাপকীয় ও কারিগরী সংক্রান্ত কার্যাবলীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার কথা বলেছেন হেনরি ফেয়ল। হেনরি ফেয়ল প্রদত্ত এই নীতি অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মীর কাজের আওতা সুনির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক।

২. কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব (Authority and Responsibility)

হেনরি ফেয়ল বলেছেন যে, কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব পরস্পর ঘনিষ্ঠতার সাথে সম্পর্কিত। কোনো কর্মীকে কার্য সম্পাদন করার জন্য কর্তৃত্ব অর্পন করার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব ও প্রদান করতে হবে। আবার এরূপ কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য থাকা উচিত অন্যথায় কার্যক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়।

৩. শৃঙ্খলা বা নিয়মানুবর্তিতা (Dicipline)

শৃঙ্খলা বলতে হেনরি ফেয়ল বুঝিয়েছেন মান্যতা, প্রয়োগ, শক্তি ও শ্রদ্ধার সংমিশ্রণ। যে-কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা অপরিহার্য। শৃঙ্খলা হলো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তার অধীনস্থ কর্মচারীদের হতে কী প্রত্যাশা করেন তা সংশ্লিষ্ট সকলকে অবগত করানো কার্য সম্পাদনের জন্য উপযুক্ত তদারকির ব্যবস্থা করা এবং ঐসব কাজ সম্পাদিত না হলে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া।

৪. আদেশের ঐক্য (Unity of Command)

আদেশেত ঐক্য নীতির মূল কথা হলো প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কর্মী শুধু একজন বসের (Boss) অধীনে থাকবে এবং তার আদেশ গ্রহণ করবে। কারণ একাধিক বসের অধীনে একজন কর্মী সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারে না। এক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা এবং সমস্যাই দেখা দেয়।

৫. নির্দেশনার ঐক্য (Unity of Direction)

সংগঠনের প্রতিটি উদ্দেশ্যের জন্য শুধু একজন প্রধান ও একটি পরিকল্পনা থাকবে; একই উদ্দেশ্য বিশিষ্ট কার্যাবলীর জন্য একটি পরিকল্পনা থাকবে এবং ঐ সকল কার্য সম্পাদনের নির্দেশ প্রদান করবেন ও একজন কর্মকর্তা; এটিই হলো নির্দেশনা ঐক্য।

৬. সাধারণ স্বার্থের জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগ (Subordination of individual to general interest)

প্রাতিষ্ঠানিক বৃহৎ স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দেওয়াকে আবশ্যল বলে মনে করেন হেনরি ফেয়ল। তবে সাংগঠনিক উদ্দেশ্য ও ব্যক্তির উদ্দেশ্যের মধ্যে যাতে কোনো রকমের বিরোধ বা অসংগতি বা সংঘাত না থাকে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

৭. পারিশ্রমিক (Remuneration)

ন্যায্য বেতন এবং মজুরি নিয়োজিত শ্রমিক-কর্মীদের প্রাপ্য। তাই বেতন ও মজুরির একটি উপযুক্ত কাঠামোর প্রবর্তন করে শ্রমিক-কর্মীদেরকে সর্বাধিক সন্তুষ্টি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। হেনরি ফেয়লের মতে, পারিশ্রমিক ন্যায্য হতে হবে এবং তা প্রদান করার যুক্তিসংগত বা সঠিক পন্থা থাকতে হবে। 

৮. কেন্দ্রীকরণ (Centralisation)

প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে এবং নিম্নস্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিকেন্দ্রিভূত থাকে। হেনরি ফেয়ল এক্ষেত্রে বলেন, কর্তৃত্বের কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের পরিমাণ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিৎ। 

৯. জোড়া-মই-শিকল (Scalar Chain)

প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত কর্তৃত্ব প্রবাহের একটি শিকল বা চেইন থাকবে। এই শিকল কর্তৃত্বের প্রবাহ ও যোগাযোগের উর্ধ্বগতি বা নিম্নগতি নির্দেশ করে। জরুরি কাজে সংগঠনের নীচু স্তরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা থাকবে। 

১০. বিন্যাস (Order) 

একটি একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূল কর্ম সংস্কৃতি রাখার জন্য একটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত এবং উপযুক্ত বিন্যাস বজায় রাখা উচিত। বিন্যাস নীতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রত্যেক কর্মী ও উপাদান (মানবীয় ও অমানবীয় বা বস্তুগত) যাতে তাদের স্ব-স্ব স্থানে থেকে সুষ্ঠু নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করতে পারে তার ব্যবস্থা করা। 

১১. সাম্য (Equity) 

সকল শ্রমিক ও কর্মীর প্রতি সমান এবং সম্মানজনক আচরণ করা উচিত। একজন ব্যবস্থাপক বা প্রশাসকের দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কেউ যেন  বৈষম্যের সম্মুখীন না হয়। 

১২. চাকরির স্থায়িত্ব (Stability of tenure) 

কর্মীদেরকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, প্রতিষ্ঠানে তারা স্থায়ীভাবে কাজ করবেন বা দীর্ঘমেয়াদে কাজ করবেন। অকারণে বা সামান্য কারণে কর্মীদের ঘনঘন বদলী বা ছাঁটাই করা অনুচিৎ, এটি ব্যবস্থাপনারই ব্যর্থতা। নির্বাহী ও সাধারণ কর্মীবাহিনীর চাকরীকালের স্থিতিশীলতা রক্ষা করে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা ব্যবস্থাপনার অন্যতম নীতি। 

১৩. উদ্যোগ (Initiative)

নতুন নতুন পদ্ধতি বা উপায় উদ্ভাবন ও আবিস্কার করার পক্ষে কর্মীদেরকে উৎসাহ প্রদান করা হেনরি ফেয়লের গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য যথোপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের আগ্রহ বাড়ে এবং উন্নত কর্মনৈপুণ্য প্রদর্শন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়। 

১৪. একতাই বল (Esprit de corps/Unity Is Strength) 

যেখানে একতা সেখানেই শক্তি। ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান নীতি হলো একে অপরকে  অনুপ্রাণিত করা এবং নিয়মিতভাবে একে অপরের সহায়ক হওয়া। একটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং বোঝাপড়ার বিকাশ একটি ইতিবাচক ও প্রত্যাশিত কর্মপরিবেশ ও ফলাফলের দিকে পরিচালিত করবে। ব্যবস্থাপকের উচিৎ তার অধীনস্থ কর্মচারীদের দলগত প্রচেষ্টা, একতা ও ভ্রাতৃত্ব বোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং এভাবেই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব।

সারাংশ

  • ব্যবস্থাপনার নীতিমালা প্রবর্তক আধুনিক ব্যবস্থাপনার জনক হেনরি ফেয়ল। 
  • ব্যবস্থাপনার মোট নীতিমালা ১৪টি।
  • ব্যবস্থাপনার প্রথম নীতি হলো কার্যবিভাগ।
  • হেনরি ফেয়ল ১৯১৬ সালে ফ্রান্সে তাঁর লেখা গ্রন্থে সর্বপ্রথম নীতিমালাগুলো উল্লেখ করেন।
  • হেনরি ফেয়লের মৃত্যুর পর তাঁর ব্যবস্থাপনা তত্ত্ব আধুনিক ব্যবস্থাপনার নীতিমালা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
  • আদেশের ঐক্যের মূল কথা হলো প্রত্যেক কর্মী একজন ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার বা বসের অধীনে থাকবে। 
  • নির্দেশনার ঐক্য বলতে বুঝায় একজন প্রধান ব্যক্তি থাকবে এবং তার কাছ থেকেই নির্দেশনা আসবে।
মু. মিজানুর রহমান মিজানhttps://www.mizanurrmizan.info
শিক্ষার্থী, মাস্টার অব এডুকেশন, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা এবং স্বাধীন লেখক।

১ টি মন্তব্য

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ