ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতি ও সাধারণ অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য এবং ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

প্রতিষ্ঠানসমূহের নিকট ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে

ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতি ও সাধারণ অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য

সাধারণ অর্থনীতির সাথে ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির কিছু মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পার্থক্যগুলো নিম্নরূপ:

১. অর্থনীতি শুধু অর্থনৈতিক নীতিমালার কাঠামো নিয়েই আলোচনা করে, কিন্তু ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতি উক্ত নীতিমালার বাস্তব প্রায়োগিক রূপরেখা কীরূপ হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করে।

২. ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য এমনই যে এর বিষয়বস্তু কেবল ব্যষ্টিক অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অপরদিকে অর্থনীতি বলতে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক উভয় প্রকার অর্থনীতিকেই বোঝায়।

৩. সাধারণ ব্যষ্টিক অর্থনীতিতে বিভিন্ন উৎপাদন ও উপকরণাদির মধ্যে আয়ের বণ্টন নিয়ে আলোচনা করা হয়। অর্থাৎ ভূমির খাজনা, শ্রমের মজুরি, মূলধনের সুদ, সংগঠনের জন্য মুনাফা ইত্যাদি বিষয়াদিই ব্যষ্টিক অর্থনীতির আলোচ্য বিষয়। কিন্তু ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতি কেবল মুনাফা বণ্টনসংক্রান্ত তত্ত্ব নিয়েই প্রধানত আলোচনা করে থাকে।

৪. ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মুনাফা সর্বাধিককরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সাধারণ অর্থনীতি বিশেষ কোন উদ্দেশ্য অর্জনের পথ নির্দেশ করে না। এটি কেবলমাত্র অর্থনৈতিক চলকগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে।

৫. সাধারণ অর্থনীতি হলো বর্ণনামূলক আর ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতি হলো উদ্দেশ্যমূলক।

৬. সাধারণ অর্থনীতিতে অতীত পরিসাংখ্যিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত তত্ত্বসমূহ আলোচিত হয়। কিন্তু ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতিতে অতীত পরিসাংখ্যিক তথ্যের ভিত্তিতে বর্ণিত তত্ত্বসমূহ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে কীরূপ ধারণ করতে পারে তাও নির্ধারণের প্রচেষ্টা চালানো হয়।

ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

আধুনিক বৃহদায়তন উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের নিকট ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ক্ষুদ্রায়তন প্রতিষ্ঠানসমূহ সাধারণত তাদের অতীত অভিজ্ঞতা এবং সরাসরি অনুমানের উপর ভিত্তি করে কোনোক্রমে তাদের বিভিন্ন প্রকার ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদন এবং কার্যক্রমের দিক থেকে বৃহৎ আকারের অথবা যেসব প্রতিষ্ঠান নতুন ধরনের দ্রব্যের উৎপাদন এবং বিক্রয়ের সাথে জড়িত সেসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এতটা জটিল এবং অনিশ্চিত যে তাদের পক্ষে শুধুমাত্র অনুমানপ্রসূত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।

সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। তাই এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানসমূহকে অর্থনীতির সাধারণ বিধি বা নিয়মাবলিকে নিজস্ব আঙ্গিকে কীভাবে সফলভাবে প্রয়োগ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায় সেই চেষ্টাই করতে হয়। অর্থাৎ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

মিল্টন এইচ স্পেন্সার এবং লুইস সিগেলম্যান-এর মতে, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অর্থনীতির প্রয়োগ বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক তত্ত্বসমূহের সমন্বয় সাধনের বিষয়টি নিম্নোক্ত কারণে গুরুত্বপূর্ণ-

১. সনাতনী তাত্ত্বিক অর্থনৈতিক ধারণাসমূহকে প্রকৃত ব্যবসায়িক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য করে তোলার জন্য ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির আশ্রয় নিতে হয়। অর্থনৈতিক তত্ত্বসমূহে সাধারণত বিভিন্ন অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কিছু মডেল দাঁড় করানো হয় এবং প্রতিষ্ঠানসমুহের জন্য সম্ভাব্য কোনো সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। কিন্তু এসব অনুমানের কারণে উক্ত মডের বা তত্ত্বসমূহ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রকৃত কার্যক্রমের ব্যাখ্যা সেসব তত্ত্ব থেকে পাওয়া যায় না। সুতরাং প্রকৃত ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কোন অর্থনৈতিক তত্ত্বকে অর্থবহ এবং এর অনুমানসমূহকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ব্যাখ্যাযোগ্য করে তুলতেই হয়। তাই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নিকট সাধারণ অর্থনীতির চেয়ে ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

২. বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনুমান তথা চাহিদার বিভিন্ন প্রকার স্থিতিস্থাপকতা পরিমাপের জন্য ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির আশ্রয় নিতে পারে। যেমন আয় স্থিতিস্থাপকতা, দাম স্থিতিস্থাপকতা, আড়াআড়ি স্থিতিস্থাপকতা, বিক্রয় প্রসারণ স্থিতিস্থাপকতা, খরচ উৎপাদন সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়াদি পরিমাপের মাধ্যমে ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতিতে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে পূর্বানুমান করা হয়।

৩. বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক পরিমাণ নির্ধারণের জন্যও ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির আশ্রয় নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ মুনাফা, চাহিদা, উৎপাদন, খরচ, দাম, মূলধন ইত্যাদির কথা বলা যেতে পারে। এসব পরিমাণ নির্ধারণ করতে হয় এজন্যই যে, এসব পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যমে অনিশ্চিৎ পরিস্থিতিতে ব্যবস্থাপকগণ মোটামুটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং আগাম পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারেন।

৪. বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক পরিমাণ নির্ধারণের পর সেগুলোর ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকার ব্যবসায়িক নীতি যেমন- দামনীতি, বিক্রয়নীতি, ক্রয়নীতি, কর্মীনীতি ইত্যাদি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির প্রয়োগ ঘটানো হয়। অর্থনৈতিক পরিমাণসমূহ নির্ধারণের সময় এমনভাবে কার্যক্রম সম্পাদিত হয় যে কোনো কৌশল অবলম্বন করা হলে কী ধরনের ফলাফল দেখা দিতে পারে এবং সেসবের সম্ভাবনার পরিমাণ কীরূপ তাও নির্ধারিত হয়। ফলে বিভিন্ন বিকল্প কৌশলের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক কৌশলটি বেছে নেয়া যায়।

৫. কোনো প্রতিষ্ঠান যে অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্যে কাজ করে এবং যেসব অর্থনৈতিক বাহ্যিক শক্তির সাথে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সাথে সমন্বয় সাধনের প্রয়োজন হয়; সেসব অর্থনৈতিক পরিবেশ ও প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিকে অনুধাবনের জন্য ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির প্রয়োগ ঘটাতে হয়। যেমন জাতীয় আয়ের পরিবর্তন, মুদ্রাস্ফীতি বা মুদ্রাসংকোচন, সরকারি রাজস্ব ও মুদ্রানীতির পরিবর্তন, বাণিজ্যচক্রের প্রভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো একদিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে থাকে, অপরদিকে একক ভাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানও এসব বাহ্যিক পরিবেশ ও শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই প্রতিষ্ঠানের উচিত বাহ্যিক অর্থনৈতিক পরিবেশ ও শক্তিকে বিশ্লেষণ, অনুধাবন এবং যথাসম্ভব সেসবের প্রতিকূলতাকে কমানোর প্রচেষ্টা চালানো। আর এই প্রেক্ষিতে ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম।

বস্তুত বর্তমানে অর্থনৈতিক জটিলতা ও অস্থিতিশীলতা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ততই নতুন নতুন তত্ত্ব ও নীতিমালা নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ হচ্ছে। কিন্তু এসব তত্ত্ব ও নীতিমালা সময়োপযোগী হওয়া সত্ত্বেও এগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার জন্য ব্যবস্থাপকীয় অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যকীয়।

(বাউবি মডিউল অবলম্বনে)

আহমেদ মিন্টো
মিন্টো একজন ফ্রিল্যান্স লেখক এবং বিশ্লেষণ'র কন্ট্রিবিউটর।
এ বিষয়ের আরও নিবন্ধ

মূল্যস্ফীতি কী এবং মূল্যস্ফীতি কীভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে?

মূল্যস্ফীতি হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের বা পণ্যসমূহের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া। মূল্যস্ফীতি বিভিন্নভাবে একটি দেশে বসবাসরত মানুষের জীবনকে...

প্রবাসে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশি ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিয়ে কৌশল, চ্যালেঞ্জ এবং এগিয়ে যাওয়ার পথ বাধা সমন্বয়হীনতা  

বাংলাদেশ হাই কমিশন, লন্ডন এর উদ্যোগে এবং অনুরোধে গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক স্মারকে জানানো হয়েছে যে, এখন থেকে...

ভোক্তাশ্রেণি মূল্যস্ফীতির ভয়ে থাকলে কোনো শাসনব্যবস্থাই সুস্থির থাকতে পারে না

আমার এক পরিচিত ব্যক্তি দিন কয়েক আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘স্যার, সেদিন বাসায় ফিরতেই গিন্নি বলল, ফ্রেশ হওয়ার আগে স্টোররুম থেকে চালের ড্রাম...

মানি লন্ডারিং কী এবং এর প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন দেশে প্রতিরোধ ব্যবস্থা

মানি লন্ডারিং হলো অপরাধ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বৈধ সম্পদে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে এই নিবন্ধে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হলো।
আরও পড়তে পারেন

টপ্পা গান কী, টপ্পা গানের উৎপত্তি, বাংলায় টপ্পা গান ও এর বিশেষত্ব

টপ্পা গান এক ধরনের লোকিক গান বা লোকগীতি যা ভারত ও বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। এই টপ্পা গান বলতে...

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলতে কী বোঝায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখাবিশেষ যেখানে পরিচালন প্রক্রিয়া, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতি সম্পর্কীয় বিষয়াবলী নিয়ে আলোকপাত করা হয়।  এরিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে রাষ্ট্র...

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কী বা গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়

গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতিরাষ্ট্রের অথবা কোনো সংগঠনের এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বা পরিচালনাব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক...

সমাজতন্ত্র কী? সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, সুবিধা, অসুবিধা ও অর্থনীতি

সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল ১৯১৭ সালে। সমাজতন্ত্রে বৈরি শ্রেণি নেই, কেননা কলকারখানা, ভূমি, সবই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সমাজতন্ত্রে শ্রেণি...

জীবনী: সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ছিলেন একজন বাঙালি লেখক ও কবি। তিনি উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রবক্তাদের একজন। সিরাজী মুসলিমদের...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here