বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

ভাদু গান কী? ভাদু গানের উৎপত্তি, বিবর্তন এবং অন্যান্য

ভাদু একটা লোকগান কিন্তু এর প্রচলন রাজপরিবারের হাত ধরে। আর তা শুরু হয় পয়লা ভাদ্র থেকে ভাদু পুজোর মধ্য দিয়ে

ভাদু গান কী

ভাদু গান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি প্রচীন সংস্কৃতির অংশ। এই ভাদু গান পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা ও বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমা এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচি ও হাজারিবাগ জেলার লৌকিক উৎসব ভাদু উৎসবে এই গান গাওয়া হয়ে থাকে। গ্রামীণ বাংলার একটি বিশেষ সংস্কৃতি হল ভাদু গান। ভাদ্র মাস হলো কিছুটা অবসরের মাস। একসময় এই অলস ভাদ্রে কোনো ছেলেকে মেয়ের পোশাক পরিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে দরিদ্র মানুষেরা ভাদু নাচ দেখাত কিছু রোজগারের আশায়। এখনো কোথাও কোথাও ভাদু উৎসব চলে, তবে তা আগের মতো নয়। ভাদু গান মানকর সংলগ্ন অঞ্চলে অন্যতম লোকসংস্কৃতি সম্পদ। কৃষি নির্ভর রাঢ়ের এই গ্রামগুলি বর্ষার অবসানে শরতের ভাদ্র মাসে ভাদু উৎসবে মুখর হয়ে উঠত। সময়ের ব্যবধানে এখন ভাদু উৎসব অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছে।

ভাদু কে, ভাদুগানের সূচনা ও বিবর্তন

রাজনন্দিনী ভাদু রাঢ়ের কুলবধূ। এই ভাদু গানের পিছনে আছে এক রাজকুমারীর করুণ কাহিনি। জনশ্রুতি, মানভূমের অন্তর্গত কাশীপুরের রাজনন্দিনী হলেন ভাদু। তাঁর রূপ সৌন্দর্য ছিল ঈর্ষণীয়। তাঁর বিবাহের ঠিক হয় বীরভূমের হেতমপুরের এক রাজপুত্রের সঙ্গে। বিয়ের দিন বিবাহ করতে আসার পথে ডাকাতদলের হাতে খুন হন ভদ্রাবতীর হবু স্বামী। শোকে মুহ্যমান হয়ে ভদ্রাবতী আত্মঘাতী হয়। কারো মতে, ভদ্রাবতী বা ভাদু চিতার আগুনে আত্মাহুতি দেয়। আবার কারো মতে, জলে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুকে বেছে নেয়। সেই ঘটনা মনে রেখে ভাদু গানের সূচনা। রাজার প্রিয় ভদ্রাবতীকে জনমানসে স্মরণীয় করে রাখতে রাজা নীলমণি সিং দেওর ভাদু গানের প্রচলন করেন।

ভাদু একটা লোকগান কিন্তু এর প্রচলন রাজপরিবারের হাত ধরে। আর তা শুরু হয় পয়লা ভাদ্র থেকে ভাদু পুজোর মধ্য দিয়ে। আগে ওই গানের আসরে ব্যবহৃত বাদ্য যন্ত্র ছিল ঢোল আর জুড়ি। সময়ের দাবি মেনে এখন সংযোজিত হয়েছে হারমোনিয়াম, ক্যাসিও এবং তবলা। কথায় আর সুরেও লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। অনুপ্রবেশ ঘটেছে ছায়াছবির গানের সুরেরও। কেবল তাই নয়, ভাদুকে কোথাও কোথাও ছায়াছবির নায়িকাদের সঙ্গেও তুলনা করা হয়। ভাদু গানের বিষয়বস্তু তাঁর কুমারী জীবন, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, অভিপ্রায়, বিয়ে, বেদনা বধূর করুণ অকাল মৃত্যু এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কিছু ঘটনা ও বৈশিষ্ট্য। কিন্তু স্মার্টফোন, টিভি, আইপডের দাপটে ভাদুর মতো লোকসংস্কৃতির ধারাটি সংকটের মুখে। ডিজিটাল এই জীবনে যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ভাদু গান, তাতে একদিন লুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা! অথচ একসময় রাঢ়দেশীয় গৃহবধূরা ভাদুকে প্রণাম করে স্বামীর মঙ্গল কামনা করতেন।

ভাদু লে লে লে পয়সা দু-আনা

‘ভাদু লে লে লে পয়সা দু-আনা, কিনে খাবি মিছরির দানা।’ জনপ্রিয় এই ভাদু গান, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত গেয়ে ও নেচে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত বেশ কিছু ভাদু শিল্পীদের ভাদ্র মাসে। কিন্তু বর্তমান মুঠোফোন, অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাদির আড়ালে দুই দশক ধরে এই ভাদু গান এবং ভাদু শিল্পীরা লুপ্তপ্রায়। দেখা যায় না এই সকল ভাদু শিল্পীদের। অথচ কয়েক বছর বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান, পুরুলিয়ার মতো রাঢ় বাংলায় গ্রামে গ্রামে দেখা যেত ভাদু শিল্পীদের। তবে বীরভূমে বেশকিছু গ্রামের সাধারণ দিনমজুর সম্প্রদায়ের মানুষ এই ডিজের যুগেও টিকিয়ে রেখেছেন এই ভাদু শিল্পকে।

ভাদ্র মাসের পয়লা তারিখ থেকে একটি মেয়েকে ঘাগরার মতো শাড়ি পরিয়ে ও মাথায় ওড়না দিয়ে ভাদু সাজিয়ে গানের সঙ্গে নাচানো চিরাচরিত রীতি। আর মাটির ভাদু মূর্তি কোলে করে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে টাকা পয়সা আদায় করেন ভাদু শিল্পীরা। ভাদু শিল্পীরা মুখে মুখে রচনা করেন গান, তাঁদের গানে উঠে আসে তাঁদের জীবন যন্ত্রণার প্রসঙ্গ, উঠে আসে সামাজিক বিষয়। ঢোল, হারমোনিয়াম, কাঁসা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গান শোনান ভাদু গানের লোকশিল্পীরা। 

সচেতনতামূলক বার্তা দেয় ভাদু গান

বর্তমান এই অবলুপ্তির সময়ে অনেক শিল্পী আছেন যাঁরা ভাদু গানকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় রয়েছেন, তাঁরা আর্থিক অনটনে এই ভাদু গান করেন এমনটা নয়, বরং তাঁরা এই ভাদুর গানকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন কেবলমাত্র গান বাঁধার নেশায় এবং সমাজ সচেতনতামূলক বার্তা সাধারণ মানুষদের কাছে তুলে ধরার জন্য।

ভাদু গান হলো লোকগান, তাই এই গানের মাধ্যমে গ্রাম্য মানুষের কাছে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়া সব থেকে বেশি সহজ। তাঁরা সারা বছর ধরে গান রচনা করেন এবং ভাদ্র মাসে গ্রামে গ্রামে গিয়ে ঘুরে বেড়ান, ছড়িয়ে দেন ভাদু গান। তাঁদের ভাদু গানের মধ্যে ফুঁটে ওঠে জল অপচয় বন্ধ করার বার্তা, গাছ লাগানোর বার্তা, প্লাস্টিক বর্জন করার বার্তা, নেশামুক্ত সমাজ গড়ে তোলার বার্তা, বাল্যবিবাহ বন্ধ করার মতো নানান সামাজিক সচেতনতামূলক বার্তা। তবে তাঁদের কথায় যেমন ফুটে ওঠে সামাজিক সচেতনতামূলক বার্তা, যেমন গান বাঁধার তাগিদে ভাদুকে আঁকড়ে ধরে রাখার কথা, পাশাপাশি তাঁদের কথাতেই রয়েছে আক্ষেপ। তাঁরা জানান, গ্রামগঞ্জে এখনও পর্যন্ত ভাদু গানের চাহিদা থাকলেও রোজগার বলতে সামান্যটুকু। বাঙালি লোকসংস্কৃতির একটা দিক হল এই ভাদু গান, আবার একথা অনস্বিকার্য যে, সংস্কৃতিই একটা দেশের ও জাতির পরিচয়পত্র।

সংস্কৃতির মধ্যে থাকে মার্জিত মানসিকতা, থাকে পূর্ণতার সাধনা। সমাজবদ্ধ মানুষের সুখ- দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ বেদনার বহিঃপ্রকাশের যে আচার-অনুষ্ঠান, তাই হল সংস্কৃতি। যা গড়ে ওঠে মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, বিশ্বাস, চিত্ত বিনোদনের উপায় হিসাবে। পরিবর্তনের স্রোতের সঙ্গে বুঝতে না পেরে বিলুপ্ত হতে চলেছে ভাদু গান। শিকড় ভুলে বাঙালি মজেছে পণ্যায়নের সংস্কৃতিতে। গ্রামবাংলার আর সব লোকশিল্পীর মতো ধুঁকছেন ভাদুশিল্পীরাও। অনেকেই অবশ্য বাপ-ঠাকুরদার রেওয়াজ বজায় রাখতে নেশার মতোই আগলে রেখেছেন এই সংস্কৃতি। তাই এই ঐতিহ্যবাহী ভাদুকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের কিছু করে দেখানো প্রয়োজন, সঙ্গে সঙ্গে সরকারি সহযোগিতাও জরুরি।

আবদুল মাতিন
লেখক ভারতের আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ