শনিবার, অক্টোবর ১, ২০২২

পরিকল্পিত শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

কারিগরি দক্ষতার ফলেই চীন তার বিশাল জনগোষ্ঠীকে 'human capital' অর্থাৎ মানবসম্পদে রূপান্তর করে শিল্পায়নে ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু করেছে

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর পরিকল্পিত শিক্ষার মাধ্যমে একটি জাতি মানবসম্পদে পরিণত হয়। পরিকল্পিত শিক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। পরিকল্পিত শিক্ষা একটি দেশের অর্থনীতিতে মানবসম্পদের জোগান দিয়ে থাকে। তাছাড়া শিক্ষা একটি দেশের দারিদ্র্যবিমোচনের প্রধান হাতিয়ার। পরিকল্পিত শিক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ যেমন— ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান অর্থনৈতিক উন্নয়নে সফল হয়েছে। এখন নারীরাও পরিকল্পিত শিক্ষার মাধ্যমে উত্পাদন ও উন্নয়নে যথার্থ ভূমিকা পালন করছে। জাতীয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘Education should be developed as to increase productivity.’

পরিপূর্ণ শিক্ষা অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। শিক্ষা মূলত দুই ধরনের। এই দুই ধরণের শিক্ষা হলো, ১. সাধারণ শিক্ষা ও ২. কারিগরি শিক্ষা।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নত দেশগুলো কারিগরি শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে উত্পাদনমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ব্যবহার ও কৌশল প্রয়োগ করে কৃষি ও শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা মূলত একটি উৎপাদনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, যা দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধিতেও সহায়তা করে। কারিগরি শিক্ষা শ্রমিকের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করে, এতে করে শ্রমিক খুব সহজেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করে শ্রমশক্তি বৃদ্ধি করে। কারিগরি শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় মূলধন তৈরি করে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা সম্ভব। যেমন— কারিগরি দক্ষতার ফলেই চীন তার বিশাল জনগোষ্ঠীকে ‘human capital’ অর্থাৎ মানবসম্পদে রূপান্তর করে শিল্পায়নে ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী বলতে আমরা স্বনির্ভর অর্থনীতিকে বুঝি। যার অর্থ, কৃষি, শিল্প ও বিজ্ঞানপ্রযুক্তি-সম্পর্কিত উন্নয়ন, যার জন্য কারিগরি শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আত্মকর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কারিগরি শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে হলেও কারিগরি দক্ষতা ও জ্ঞানের অভাবে এদের শিল্প খাতে নিয়োগ করা যাচ্ছে না।

আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষা মূলত সনদকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। নির্দিষ্ট সময় পরপর বা নির্দিষ্ট স্তর সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থী সনদ অর্জন করে থাকে এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির বা স্তরের শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের পর সনদ প্রদানের জন্যই এই শিক্ষা পরিচালিত হয়। তবুও সৃষ্টি হচ্ছে না যথাযথ কর্মসংস্থান, যার ফলে Demographic Dividend নামক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হতে চলেছে। সাধারণ শিক্ষায় কেবল পুঁথিগত তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়, যাতে সৃজনশীলতা ও উত্পাদনশীলতার অভাব রয়েছে। আবার উচ্চশিক্ষা ব্যক্তিগতভাবে লাভজনক হলেও অনেক সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করে না। কারণ তা কেবল উন্নতমানের চাকরি পাওয়ার মাপকাঠি, যা কেবল অনুত্পাদনশীল খাতে আয় করতে সুবিধা দেয়।

সর্বোপরি শিক্ষার মাধ্যমেই একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। একটি দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ধনী হলেও এর মানে এই নয় যে, দেশটি অর্থনৈতিকভাবেও সমৃদ্ধশালী। যেমন অ্যাঙ্গোলা তেলসমৃদ্ধ দেশ, কিন্তু দরিদ্র। কারণ দেশটিতে শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেওয়ায় অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ের মতো দেশগুলো দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি লাভ করেছে। জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি রাষ্ট্র শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষায় বিনিয়োগে Rate of Return সর্বদাই অধিক। শিক্ষায় প্রয়োজনীয় ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ একটি দেশের জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে রূপান্তর করে অর্জন করতে পারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

সম্পা সিকদার
সম্পা সিকদার একজন তরুণ প্রাবন্ধিক। বর্তমানে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।