বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

আফগানিস্তান: চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তান কেমন সম্পর্ক রাখবে তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের সাথে

তালেবান যখন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল, তখন এই দেশটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় একঘরে

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তান এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। দেশটিতে তালেবান ফিরে আসার পর বিশ্বের প্রায় সকল দেশ যখন দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে, তখন চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানে দেখা যাচ্ছে কিছুটা ভিন্ন প্রতিক্রিয়া।

তালেবান আপন মহিমায় ফিরে আসায় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ যখন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল শহরে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস থেকে জরুরি ভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে আনছে তাদের কূটনীতিকদের, তখন এই তিন দেশ অর্থাৎ চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে।

এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে তাতে, চীন বলেছে, তারা আফগানিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গভীর করতে প্রস্তুত। পাশাপাশি আফগানিস্তানে এত বছর ধরে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেরও সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই আফগান যুদ্ধকে চীন অন্যায় হিসেবে বর্ণনা করছে। রাশিয়া নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করে দিয়ে বলেছে যে, কাবুল থেকে কূটনীতিকদের নিয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। আর অপরদিকে আফিগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তালেবান কর্তৃক পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। ইমরান খান বলেছেন, আফগানিস্তানের জনগণ অবশেষে দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙেছে।

তালেবান যখন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল, তখন এই দেশটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় একঘরে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সেরকম না-ও হতে পারে, সেরকম ইঙ্গিত এখনই দেখা যাচ্ছে।

আর তালেবানের নেতারাও চেষ্টা করছেন বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সমর্থন আদায়ের জন্য। এর জন্য তালেবান নেতারা যেমন বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ করছেন, তেমনই ক্ষণে ক্ষণে নিজেদের পরিবর্তিত অথচ ইতিবাচক নীতি সম্পর্কে বিশ্বকে জানান দিচ্ছেন যাতে বিশ্ববাসীর একটা স্পষ্ট সমর্থন তারা পায় সেই আশায়। আফগানিস্তান দখলের পর তালিবান তাদের তাদের প্রথম সংবাদ সম্মেলনেও জানিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রু চায় না। সংবাদ সম্মেলনে তালেবান নেতা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এরকম আরও অনেক বিষয়ে কথা বলেছেন।

বিবিসি মনিটরিংয়ের চীনা মিডিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক কেরি অ্যালেন লিখেছেন, আফগানিস্তানে যা ঘটছে, তাই এখন চীনা গণমাধ্যমের শিরোনাম দখল করে আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় আফগানরা কী রকম বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছে বলে বোধ করছে, সেটাই প্রাধান্য পাচ্ছে চীনা গণমাধ্যমের খবরে। চীনের সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্বর আচরণ এবং অন্যায়ভাবে আফগানিস্তানে যুদ্ধ পরিচালনার মতো বিষয়ে ফোকাস করা হচ্ছে।

আফগানিস্তানে তালেবানের জয়যাত্রা রাশিয়ার গণমাধ্যমেরও প্রধান শিরোনাম দখল করে আছে। তবে সেখানে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনের অনধিকার চর্চাকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তালবানের আফগানিস্তান দখল রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়য়ে। রাশিয়ার গণমাধ্যমগুলো অবশ্য সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও এড়িয়ে যায়নি। সেখানের মিডিয়াগুলো এমনটাই বলছে, উদ্ভুত পরিস্থিতি রাশিয়া ও এর মিত্রদের জন্য যে ঝুঁকি বাড়বে, সেটা মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যে, রাশিয়া আফগানিস্তান থেকে দূতাবাস সরানো এবং সেখান থেকে নিজেদের কূটনীতিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছে না।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয় সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে বেশ চর্চা হচ্ছে। তিনি সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে বক্তৃতায় বলেন, আফগানরা দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙেছে। ১৯৯৬ সালে মাত্র যে তিনটি দেশ তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, পাকিস্তান ছিল তার একটি। পাকিস্তানের দুটি প্রধান ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামি ও জেইউআই-এফ এরই মধ্যে আফগান তালেবানকে তাদের বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তালেবান প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে এখনো নিজের অবস্থান পরিস্কার করেননি। তিনি বলেছেন, তালিবানের আফগানিস্তান নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভাবতে হবে বা আলোচনার প্রয়োজন আছে।

মনির হোসেন
কন্ট্রিবিউটর, বিশ্লেষণ

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ