শনিবার, অক্টোবর ১, ২০২২

যেসব ইবাদত অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত

বান্দার অন্যতম অন্তরের ইবাদত হলো- আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা স্থাপন করা

মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত ৫৬)

ইবাদতের মধ্যে কিছু আছে শারীরিক ইবাদত, যেমন- নামাজ ও রোজা। কিছু আছে আর্থিক ইবাদত, যেমন- হজ, যাকাত, কুরবানি ইত্যাদি। আবার কিছু ইবাদত এমন, যে-গুলো অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ মন আমাদের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রক। যখন মন ঠিক পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, তখন অন্য সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও ঠিক হয়ে যায়। পাশাপাশি সেগুলোর ইবাদতও যথার্থ হতে থাকে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আর্থিক ইবাদতগুলো প্রাণ ফিরে পায়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘জেনে রেখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই ঠিক হয়ে যায়। আর যখন তা খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীর খারাপ হয়ে যায়। জেনে রেখো, ওই গোশতের টুকরা হলো কলব (অন্তর)।’ (বুখারি, হাদিস ৫২)

অতএব অন্তরের ইবাদতগুলোর মাধ্যমে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা গেলে, অন্য ইবাদত আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যাবে। আজকে আমরা আলোচনা করব, এমন কিছু ইবাদত নিয়ে, যেগুলো অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা

ইমানের পর বান্দার অন্যতম অন্তরের ইবাদত হলো- আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা স্থাপন করা। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তরে আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ভালোবাসা জন্ম নেবে না, ততক্ষণ বান্দা ইবাদতের স্বাদ পাবে না। ইমানে পূর্ণতা আসবে না। এ কারণে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যারা ইমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালোবাসায় দৃঢ়তর।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৬৫)

আল্লাহর রহমতের আশা করা

অন্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো, আল্লাহর রহমতের আশা করা। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে আমল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আল্লাহর রহমত থেকে নৈরাশ হয়ে যাওয়া পথভ্রষ্টতার লক্ষণ। পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘তিনি (আল্লাহ) বলেন, যারা পথভ্রষ্ট, তারা ছাড়া আর কে তার রবের অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়?’ (সুরা হিজর, আয়াত ৫৬)

তাই গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করে আল্লাহর রাস্তায় ফিরে আসতে হবে। এবং আল্লাহর রহমতের আশা করতে হবে। আশা করা যায়, আল্লাহ মাফ করে দেবেন

 আল্লাহকে ভয় করা

আল্লাহর ইবাদত করতে হবে আশা ও ভয় নিয়ে। আল্লাহর ভয়ে সব ধরনের গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহর রহমতের আশা রাখতে হবে মানে এই নয় যে বেপরোয়া হয়ে উঠবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি আল্লাহর কৌশল থেকেও নিরাপদ হয়ে গেছে? বস্তুত ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া কেউ আল্লাহর কৌশলকে নিরাপদ মনে করে না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত ৯৯)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে তো শয়তান। সে তোমাদের তার বন্ধুদের ভয় দেখায়। তোমরা তাদের ভয় করো না; বরং আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৭৫)

রাসুল (সা.)-এর ভাষ্যমতে, সাত শ্রেণির মানুষ কঠিন কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবে। তাদের অন্যতম হল, ‘যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আল্লাহর ভয়ে তার চোখ থেকে অশ্রু বের হয়ে পড়ে।’ (বুখারি, হাদিস ১৪২৩)

ইখলাস

ইখলাস হল আমল ও ইবাদতের প্রাণ। এর সম্পর্ক অন্তরের সঙ্গে। তাই পবিত্র কুরআনে ইখলাসের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের এ ছাড়া আর কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত ৫)

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, মহানবি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের শরীর ও অবয়বের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে লক্ষ করেন।’ (মুসলিম, হাদিস ৬৪৩৬)

রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসা

প্রকৃত ইমানদার হতে হলে রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসতে হবে। রাসুল (সা).-এর প্রতি দৃঢ় ভালোবাসা অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ইমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে।

১. আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে বেশি প্রিয় হওয়া;

২. কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা;

৩. কুফরিতে ফিরে যাওয়া আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছ¨ করা।’ (বুখারি, হাদিস ৬০৪১)

আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা 

অন্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল, কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা; নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। এর প্রতিদানস্বরূপ মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন বিশেষ সংবর্ধনা দেবেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নবি নন এবং শহিদও নন। কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর দরবারে তাঁদের মর্যাদার কারণে নবিরা ও শহিদরা তাঁদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হবেন। সাহাবিরা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের অবহিত করুন, তাঁরা কারা? তিনি বলেন, তাঁরা ওই সব মানুষ, যাঁরা আল্লাহর মহানুভবতায় পরস্পরকে ভালোবাসেন, অথচ তাঁরা পরস্পর আত্মীয়ও নন এবং পরস্পরকে সম্পদও দেননি। আল্লাহর শপথ! তাঁদের মুখমণ্ডল যেন নুর এবং তাঁরা নুরের আসনে উপবেশন করবেন। তাঁরা ভীত হবেন না, যখন মানুষ ভীত থাকবে। তাঁরা দুশ্চিন্তায় পড়বেন না, যখন মানুষ দুশ্চিন্তায় থাকবে। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, ‘জেনে রেখো! আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে না।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত ৬২) (আবু দাউদ, হাদিস ৩৫২৭)

মহান আল্লাহ আমাদের সবার অন্তর পরিশুদ্ধ করুন। অন্তরের পাশাপাশি আমাদের সব ইবাদত কবুল করুন। আমিন।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।