শনিবার, অক্টোবর ১, ২০২২

কারবালা যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগের মর্মকথা

কারবালা ময়দানে যুদ্ধের পূর্বক্ষণে ইমাম হোসাইন এজিদপক্ষীয় সৈন্য ও কুফাবাসীদের লক্ষ করে বলে ছিলেন, আমি কে তা আপনাদের অজানা নয়

পৃথিবীর ইতিহাসে কারবালা হত্যাকাণ্ডের মতো নির্মম ও জঘন্য হৃদয়বিদারক রক্তপাত হওয়ার নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। কেন যায় না এবং কি জন্য যায় না, আসুন, এবার তার তত্ত্ব ও মর্ম উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। সকল অবস্থায় আল্লাহপাকই আমাদের সহায়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, নবি করিম (সা.) হিজরি একাদশ সালের ১২ রবিউল আউয়াল ইন্তেকাল করেন। দুনিয়া হতে পর্দা করার পূর্বে তিনি মসজিদে নববির মিম্বরে বসে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমার ইন্তেকালের পর ‘খিলাফাতুন আলা মিনহাজিন নবুওয়াত’ অর্থাৎ নবুওয়াতের প্রশাসনিক রূপরেখা অনুসারে প্রতিনিধিত্বসুলভ শাসনব্যবস্থা ত্রিশ বছর যাবত অব্যাহত থাকবে। তারপর এই শাসনব্যবস্থা ‘আমারত’ অর্থাৎ রাজতন্ত্রের রূপ পরিগ্রহ করবে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূর্ণতা সাধিত হয়েছিল সাইয়্যেদেনা হযরত ইমাম হাসান (রা.)-এর খলীফার পদ পরিত্যাগের মাধ্যমে। যার মূলে ছিল কুটিল ষড়যন্ত্রের এক অন্ধকার প্রতিচ্ছায়া।

এই সুবাদে হযরত মুয়াবিয়া রা. খলীফা পদে সমাসীন হন এবং নিজেকে ‘আমির’ উপাধিতে বিভংষিত করেন। এতে করে ‘খিলাফাতুন আলা মিনহাজিন নবুওয়াত’-এর পরিসমাপ্তি ঘটে। এই বিষয়টি আরো প্রকট রূপ ধারণ করে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক স্বীয় পুত্র এজিদকে খলিফা বলে ঘোষণার মাধ্যমে। এতসব ষড়যন্ত্র ও দুনিয়ালোভী কার্যক্রম সাইয়্যেদেনা হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-কে ব্যথিত ও মর্মাহত করে তুলেছিল। তিনি মনে-প্রাণে খিলাফাতুন আলা মিনহাজিন নবুওয়াতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এবং সত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।

তাই তিনি অগণতান্ত্রিকভাবে ঘোষিত খলিফা এজিদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করাকে ঘৃণাভরে বর্জন করেছিলেন। তার এই দৃঢ় প্রত্যয় সম্ভূত ন্যায় ও কল্যাণবহ আকুতি প্রকাশ পেয়েছিল স্বীয় স্বজনদের অনুরোধের উত্তরে। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, যে খেলাফত নবুওয়াতের ক্রমধারাপুষ্ট ব্যবস্থার বিপরীত, তা আমি এবং আমরা মেনে নিতে পারি না। এর জন্য যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে আমরা প্রস্তুত। কেননা, আমরা আল্লাহর অনুগত বান্দাহ এবং বিশ্বনবি মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রতি একান্তই বিশ্বাসী এবং শ্রদ্ধাশীল। এর ব্যতিক্রম কোনো কিছু আমরা কখনোই মেনে নেব না।

কারবালা ময়দানে যুদ্ধের পূর্বক্ষণে তিনি এজিদপক্ষীয় সৈন্য ও কুফাবাসীদের লক্ষ করে বলে ছিলেন, আমি কে তা আপনাদের অজানা নয়। আমি পরকালে জান্নাতি যুবকদের সর্দাররূপে বরিত হব। আমাকে কুফা আগমনের জন্য আপনারাই বহু আমন্ত্রণপত্র প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু আজ আপনারা এসব কথা বেমালুম ভুলে গেছেন কেন? এই কেন এর সদুত্তর প্রতিপক্ষের দিক থেকে উচ্চারিত হয়নি। বরং তারা তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে সত্যোজ্জ্বল কিরণ ধারাকে নির্বাপিত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছিল, যা কালের খাতায়, ইতিহাসের পাতায় কলঙ্ক-কালিমার পঙ্কিল আবর্তে চিরকাল ঘুরপাক খেতে থাকবে।

বস্তুত সাইয়্যেদেনা হযরত ইমাম হোসাইন রা. খিলাফাতুন আলা মিনহাজিন নবুওয়াতকে চির উন্নত ও চির প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই ধূসর কারবালার তপ্ত মরুর দাবদাহ ও ক্ষুৎ-পিপাসার জ্বালা সহ্য করে আল্লাহর রাস্তায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি জানতেন, এই পথে বুকের রক্ত অকাতরে বিলিয়ে যে দিতে পারে, সে-ই পরকালে কামিয়াবী ও সফলতা লাভে ধন্য হবে এবং আল্লাহপাকের কুরবত ও নৈকট্যের শামিয়ানার নিচে আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ লাভ করবে। এর কোনো অন্যথা হবে না।

আমরা এ-ও জানি যে, খিলাফাতুন আলা মিনহাজিন নবুওয়াত অবশ্যই দুনিয়াতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। এই খিলাফতের ঘোষণা পবিত্র কাবা গৃহের ছাদে দাঁড়িয়ে হযরত জিব্রাইল (আ.) প্রদান করবেন। তিনি বলবেন, ‘হাজা খালিফাতুল্লাহিল মাহদিয়্যি, ফাআবিহু ওয়াত্তাবিয়ূহুণ অর্থাৎ তিনিই হচ্ছেন, আল্লাহর খলীফা মাহদি (আ.)। তোমরা তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করো। চলতি হিজরী ১৪৪২ সালের পৈঠায় দাঁড়িয়ে আমরা এর প্রতীক্ষার প্রহর গুনে চলেছি। জানি না, সেই মধুময় ক্ষণ আমাদের জীবনে দেখা দেবে কি না। তবুও ‘আশায় মোরা বাঁধছি বাসা মর্তবাসী ক্ষুদ্র নর।’ আল্লাহপাক আমাদের সহায় হোন। আমিন।

বিশ্লেষণ-এর সকল লেটেস্ট নিবন্ধ পেতে Google News-এ অনুসরণ করুন

নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান আমাদেরকে। নিচের মন্তব্যের ঘরে সংক্ষেপে লিখুন আপনার মন্তব্য। মন্তব্যের ভাষা যদি প্রকাশযোগ্য হয় তবে তা এখানে প্রকাশিত হবে। আর যদি আপনার কোনো অপ্রকাশিত নিবন্ধ বিশ্লেষণ-এ প্রকাশ করতে চান তাহলে নিম্নোক্ত ইমেইলে তা পাঠিয়ে দিন নিজের নাম, পরিচয় ও ছবিসহ।

ইমেইল: [email protected]

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের অন্যান্য নিবন্ধ

সমাজমাধ্যম

সাম্প্রতিক মন্তব্য

সবচেয়ে জনপ্রিয়
সবচেয়ে জনপ্রিয়

গবেষণা: গবেষণার সংজ্ঞা, ধারণা ও প্রকারভেদ

গবেষণা হলো কোনো কিছু সম্পর্কে জানার জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং একটি গবেষণা শুধু একটি প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দুই বা ততোধিক প্রকারের হতে পারে

শিক্ষা কী? শিক্ষার সংজ্ঞা, ধারণা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে নিয়েছেন শিক্ষাকে, নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন। শিক্ষাবীদ কিংবা মনিষী, যার সংজ্ঞাই দেখা হোক না কেন, খুব একটা সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। তাই বলে যাদের হাত ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত এসেছে তাঁদের মতো শিক্ষাবিদ বা মনিষীদের বলে যাওয়া বা লিখে যাওয়া কথাগুলোকে এড়িয়ে চলাও সম্ভব নয়।

মূল্যবোধ কাকে বলে এবং মূল্যবোধের উৎস ও প্রকারভেদ কী?

মূল্যবোধ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Value এটি গঠিত হয়েছে...

পরিবার কাকে বলে? পরিবারের সংজ্ঞা, ধারণা, প্রকারভেদ, কার্যাবলি ও গুরুত্ব কী?

আমরা জন্ম থেকেই পরিবারের সাথে পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই অবগত...

শিক্ষা: অভীক্ষার সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য

শিক্ষাক্ষেত্রে অভীক্ষা খুবই পরিচিত একটি পদ। যারা শিক্ষাবিজ্ঞান পড়েছেন...

নেতা ও নেতৃত্ব কাকে বলে? একজন আদর্শ নেতার গুণাবলি কী?

নেতৃত্বের মূল কাজ হলো আওতাভুক্ত ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করা, যাতে তারা নেতার নির্দেশ মেনে নেয় ও সে মোতাবেক কাজ করে। 

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার সংজ্ঞা, পরিধি এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন মানব সংগঠনের সাথে...

ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসের বিষয়বস্তু, উপাদান এবং ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী?

ইতিহাস পাঠ করার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন ইতিহাস কী, ইতিহাসের প্রকৃতি কীরূপ; আবার পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাসের ভূমিকা কী। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট কালের এবং নির্দিষ্ট দেশের ইতিহাস জানার সাথে সমসাময়িক প্রাকৃতিক অবস্থা এবং পরিবেশ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এই নিবন্ধে ইতিহাসের সংজ্ঞা, বিষয়বস্তু, উপাদান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনার নীতি বা মূলনীতি কয়টি ও কী কী?

ব্যবস্থাপনা কী? ব্যবস্থাপনা একটি বাংলা শব্দ যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো...

সুশাসন কী? সুশাসনের ধারণা, সংজ্ঞা ও উপাদান কী?

সুশাসন হলো এক ধরনের শাসন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্ষমতার...

শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

পাঠকে ফলপ্রসূ করার জন্য শিক্ষক পরিস্থিতি অনুসারে একাধিক পদ্ধতি ও কৌশলের সংমিশ্রণে নিজের মতো করে পাঠ পরিচালনা করতে পারেন। পাঠের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং বিষয়জ্ঞান ও শিখন পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগের উপর।