বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১

বাংলা সাহিত্যের কৃষ্ণ ও ভগবান কৃষ্ণ কি এক?

ভারতীয় সাহিত্যে কৃষ্ণ নামে একাধিক চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়

সাধারণ অর্থে বিষ্ণুর উপাসক বৈষ্ণব এবং বৈষ্ণবদের সঙ্গীত বৈষ্ণব পদাবলী। কিন্তু বাংলাভাষার প্রথম বৈষ্ণব পদকর্তা বড়ু চণ্ডীদাস এবং বিদ্যাপতি উভয়ই অবৈষ্ণব। যে সময় হিন্দুধর্ম মূলত বৈষ্ণব, শাক্ত, বৌদ্ধ, শৈব প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন নামে বিভক্ত ও পরিচিত এবং যেসময় এ মতাবলম্বীদের মধ্যে খানিকটা অসুস্থ প্রতিদ্বন্দিতা বা প্রতিযোগিতা বর্তমান; সেই সময় বাসুলীর উপাসক বড়ু চণ্ডীদাস এবং শিবের উপাসক বিদ্যাপতির বিষ্ণু বা কৃষ্ণ সম্পর্কিত পদ রচনার বিষয়কে একটা মহৎ বা উদার মনোভাবের পরিচয় বলেই সমালোচকগণ মনে করেন। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় বিষয়টি সম্ভবত তা নয়। কারণ কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, রচিত হলেও সেখানে কৃষ্ণ চরিত্রে আমরা দেবতার বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করিনা। এতদ্ব্যতীত যে রাধাকে সেখানে উপস্থাপন করা হয়েছে; সেই রাধাও মহাভারত, গীতার মতো মূল বৈষ্ণব সাহিত্যে উপস্থিত নয়। কাজেই বিষ্ণুর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধার কারণেই চণ্ডীদাস এ কাব্য রচনা করেছেন; এ কথা জোর দিয়ে বলার উপায় নেই। একই কথা বিদ্যাপতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য । মিথিলার বিখ্যাত শৈব কবি বিদ্যাপতি বাংলা ভাষায় কৃষ্ণ বিষয়ক যেসব সাহিত্য রচনা করেছেন সেগুলো যে কৃষ্ণকে বৃহৎ বা মহৎ হিসেবে উপস্থাপনের জন্যই করেছেন- এ কথা সন্দেহাতীত ভাবে বলার যুক্তি কোথায়? বরং প্রকৃত কৃষ্ণভক্ত চৈতন্যের আবির্ভাবের পরই আমরা আদিরস বিবর্জিত বিশুদ্ধ ধারার বৈষ্ণব সাহিত্য প্রত্যক্ষ করি। অবশ্য পূর্ববর্তী লেখকদের প্রভাবের কারণে কৃষ্ণের শৌর্য-বীর্য-বীরত্বের পরিবর্তে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম ভক্তি বিষয়ক কাহিনি এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। জীবাত্মা ও পরমাত্মা পরিচয়ের রূপকে; সৃষ্টি ও স্রষ্টার পারস্পরিক আকর্ষণ, আবেগ, মান, অভিমান, বিচ্ছেদ প্রভৃতি এতে অনুপম সৌন্দর্যে চিত্রিত হয়।

কৃষ্ণের সাথে রাধা

কৃষ্ণের সঙ্গে রাধার অস্তিত্ব প্রসঙ্গ মহাভারত, গীতা বা পূর্ববর্তী কোনো ধর্মগ্রন্থে নেই। বিষ্ণু পুরাণে পরিলক্ষিত হলেও অত্যন্ত পবিত্রভাবে তা প্রত্যক্ষগোচর। আদি রসাত্মক রূপে ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণে অনেকটা দৃষ্ট হয় বটে, তবে জয়দেবের গীত গোবিন্দেই তার স্পষ্ট প্রকাশ। অতঃপর বাংলাভাষার কবি বড়ূ চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি প্রমুখ এ ধরনের কাব্য অত্যন্ত যত্ব সহকারে করেছেন নির্মাণ।

কৃষ্ণের সঙ্গে রাধার অস্তিত্ব প্রসঙ্গ মহাভারত, গীতা বা পূর্ববর্তী কোনো ধর্মগ্রন্থে নেই

বড়ু চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জয়দেব বৈষ্ণব নন

কিন্তু বড়ূ চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি যেমন বৈষ্ণব কবি নন, তেমনি জয়দেবও নন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গোষ্ঠীভূক্ত কোনো ব্যক্তি। এমনকি ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণও নয় বিষ্ণু পুরাণের সমবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোনো গ্রন্থ। কাজেই বাংলার সাহিত্যিক কর্তৃক সৃষ্ট কৃষ্ণে অনেকেই মনে করেন পূর্ববর্তী কৃষ্ণ অপেক্ষা ভিন্ন বা স্বতন্ত্র।

মহাভারত, গীতা ও চৈতন্যের কৃষ্ণ

গবেষক সমালোচকদের এই ধারণা সম্ভবত ভ্রান্ত নয়; মহাভারত, গীতায় বর্ণিত কৃষ্ণের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে চিত্রিত কৃষ্ণের এত বিশাল পার্থক্য যে; তাদের দুজনকে এক মনে করা সত্যি ভীষণ কষ্টকর। যদি বাংলা সাহিত্যের আদিমধ্যযুগে বর্ণিত কৃষ্ণ নতুন কৃষ্ণ হয়ে থাকেন; কিংবা মহাভারত, গীতার কৃষ্ণই যদি এতদঞ্চলে স্থুলভাবে উপস্থাপিত হয়ে গ্রাম্যরূপ ধারণ করে থাকেন, তবে শ্রীচৈতন্য তাকেই দিয়েছেন আধ্যাত্মিক বা এশ্বরিক রূপ। শ্রীচৈতন্যের আরাধ্য যে কৃষ্ণ; তিনি নন মহাভারতের কৃষ্ণ, এমনকি তিনি নন গীতারও কৃষ্ণ। রাধার সঙ্গে সম্পৃক্ত চঞ্চল কৃষ্ণ আসলে জয়দেবের কৃষ্ণ; বড়ু চণ্ডীদাসের কৃষ্ণ। বৈষ্ণবদের হাতে মার্জনা লাভ করে পরবর্তীতে তিনিই হয়েছেন প্রেমিক কৃষ্ণ; পরমাত্মা কৃষ্ণ। গীতা, মহাভারত, ভাগবতের কৃষ্ণের সঙ্গে একীভূত হয়ে অতঃপর তিনিই হয়েছেন ভগবান কৃষ্ণ, অবতার কৃষ্ণ। 

গীতায় কৃষ্ণ স্বয়ং ঈশ্বর হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। আবার দুর্গতির চরম অবস্থায় তিনিই যুগে যুগে বিভিন্নরূপ ধারণ পূর্বক পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন বলে উল্লেখ সহ সমগ্র জগতের স্রষ্টা; আবার তিনিই বিষ্ণুর অবতার, তিনিই পার্থের সারথি, তিনিই কুরুক্ষেত্রের মহাবীর অর্জনের গুরু বা শিক্ষক। 

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের মূল ভিত্তি হচ্ছে ভক্তি। এর মাধ্যমে ভক্ত সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। এ সম্পর্ক অতীন্দ্রিয়, আর এ কারণে তা অনির্বচনীয়। 

বৈষ্ণবদের ভক্তি প্রেমের স্তর

বৈষ্ণবদের ভক্তি প্রেমকে ছয়টি স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে। অবশ্য কেউ কেউ ব্রহ্মানন্দ স্তরকে বাদ দিয়ে একে পাঁচটি স্তরে করেছেন বিভক্ত।

স্তর সমূহ হচ্ছে-

১. ব্রহ্মানন্দ;

২. শান্তরতি;

৩. বাৎসরতি;

৪. দাস্যরতি;

৫. সখ্যরতি;

৬. মধুর রতি। 

প্রথম স্তরের ভক্ত স্রষ্টাকে অতি প্রাকৃত রূপে কল্পনা করে তার ধ্যানে মগ্ন হন। দ্বিতীয় স্তরের ভক্ত শ্রষ্টাকে চতুর্ভুজ নারায়ণ রূপে কল্পনা করে তীর পূজা অর্চনা করেন। তৃতীয় স্তরে কৃষ্ণ উপাসিত হন সন্তান রূপে। (যশোদার সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্ক বাৎসরতি)।

৪র্থ স্তরে ভক্ত নিজেকে কৃষ্ণের দাস রূপে কল্পনা করেন। এ ক্ষেত্রে কৃষ্ণর প্রতি ভক্তের থাকে সীমাহীন শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম। ৫ম স্তরে ভক্ত হন কৃষ্ণের সখা বা বন্ধু এ ক্ষেত্রে শর্টার প্রতি ভক্তের সন্ত্রমবোধের হবাস ঘটে । ষষ্ঠস্তরে কৃষ্ণ ভক্তের প্রেমিক। এ ক্ষেত্রে সন্ত্রমবোধের পরিবর্তে প্রেম ও ভালবাসা প্রাধান্য পায়।

বাংলাদেশের, বিশেষত সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ স্তরের ভক্তি প্রেমই স্পষ্ট ভাবে প্রত্যক্ষ হয়। সঙ্গীত এমনকি কীর্তন পালাতেও এই রূপ সমূহই আমরা প্রত্যক্ষ করি বেশি। 

সাহিত্যের কৃষ্ণ ও ভগবান কৃষ্ণ নিয়ে শেষকথা

ভারতীয় সাহিত্যে কৃষ্ণ নামে একাধিক চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে সকল কৃষ্ণই অভিন্ন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এমনকি বৈদিক সাহিত্যের বিষ্টু এবং পৌরাণিক নারায়ণও তার সাথে হন একীভূত। সমবৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বিভিন্ন চরিত্রের একই পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে কৃষ্ণ কাহিনির পরিধিই যে কেবল বৃদ্ধি পায় তা নয়; বিভিন্ন মতের সমন্বয়ে একটি অখণ্ড বৃহৎ মত সৃষ্টি হওয়ার পথও এতে হয় উন্মুক্ত।

ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

১ টি মন্তব্য

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ