বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

শামস-ই-তাবরিজি ও সুইট ব্লাসফেমি

শামস্-ই-তবরিজি এবং জালালউদ্দিন রুমি ত্রয়োদশ শতকের এই দু’টি মানুষকে নিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে বসে এলিফ শাফাক নামের একজন লেখক

ত্রয়োদশ শতকের বিশ্ব বিশ্রুত ধর্মতাত্ত্বিক, সুফি সাধক এবং ফার্সি ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জালালউদ্দিন মুহাম্মদ বালখি রুমি বা রুমির কথা সকলেই শুনেছেন তাঁর কবিতার অনুবাদ হয়েছে বাংলা ভাষায়, তাঁর উত্তরাধিকার যে সুফি সাধনায় তার ধারা ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে। সে ধারা এখনও মুছে যায়নি রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ  তাঁর কবিতার ভক্ত ছিলেন। এ সব কারণে রুমি সম্বন্ধে বাঙালিদের একটা আবছা ধারণা থাকলেও তাঁর গুরু বা ওস্তাদ শামস্-ই তবরিজি সম্পর্কে অনেকেরই জানা নেই। 

শামস্-এর জন্ম দ্বাদশ শতকের শেষার্ধে, পারস্যের তাবরিজ নামক স্থানে। শামস্ শব্দটির অর্থ সূর্য। তাঁর জীবনের কথা খুব বেশি কিছু জানা যায় না। আর যে টুকু বা জানা যায়, তা নিয়েও নানা মতভেদ আছে। তবে এটুকু বলা যায় যে, রুমির সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তিনি পরিব্রাজক দরবেশের জীবনকাটাতেন, আর স্বপ্নের অর্থ বিশ্লেষণ করে ক্ষুণ্ণি বৃত্তি করতেন। বলা হয়, এক সময় তিনি ভাবতেও বলতে লাগলেন যে, এতদিনের সাধনায় যা সঞ্চয় হয়েছে, তা কাউকে দিয়ে যেতে চান। বলতেন, ‘এমন কে আছে, যে আমার সঙ্গ সহ্য করবে?’ একদিন কেউ জানতে চাইল যে সেরকম কাউকে পেলে তুমি প্রতিদানে কী দেবে? শামস্ তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, ‘আমার মাথা।’ যখন রুমির সঙ্গে দেখা হলো, তখন তাঁর ষাটের কাছাকাছি বয়স। রুমি থাকতেন কোনিয়া নামের একটি শহরে। সেখানে তিনি ছিলেন মৌলবি আর স্থানীয় মসজিদে তাঁর ধর্মোপদেশ শুনতে ভিড় করতেন সমাজের সব স্তরের মানুষ। তিনি নিয়মিত ভক্ত-শিষ্য পরিবৃত হয়ে মসজিদে যেতেন। ১২৪৪ সালের তেমনই একদিন ঘোড়ার পিঠে চেপে মসজিদ যাওয়ার পথে অপরিচিত দরবেশ শামস্ তাঁর পথ আটকালেন। বললেন, তিনি রুমিকে প্রশ্ন করতে চান। রুমি সম্মত হলে তিনি বললেন যে, ঘোড়ার উপরে চড়ে সে প্রশ্ন শোনা যাবে না। আগে প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতাকে একই মাটির উপর দাঁড়াতে হবে। রুমি রাজি হলেন। শামস্-এর কথায় অভিভূত হলেন রুমি। সে প্রশ্নোত্তরের পরের চল্লিশ দিন রুমি একান্তে নিজ গৃহের গ্রন্থাগারে  তাঁর সঙ্গে কাটালেন। চল্লিশ দিন পর বাইরে বেরিয়ে এলেন এক নতুন মানুষ, পণ্ডিত রুমি থেকে প্রেমের পূজারি সুফি সাধক রুমি।

শামস্-এর তীক্ষ্ণ সত্য বচন সহ্য করতে পারতেন না অনেকেই। তার উপরে তাঁর প্রভাবেই রুমি শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়েছেন, ছেড়ে দিয়েছেন মসজিদের ধর্মোপদেশ আত্মীয়-শিষ্য-বান্ধবেরা আর তেমন করে তাঁর সঙ্গ পান না। দিনের বেশিরভাগ কাটে শামস্-এর সঙ্গ সুধায়। রুমির আচরণও যেন তখনকার গোঁড়া ধার্মিকদের সঙ্গে মেলে না। তিনি ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত ভেদ করেন না। যাঁর মধ্যে প্রকৃত প্রাণের খোঁজ পান, তাঁর সঙ্গেই হয় বন্ধুত্ব তাঁদের উপাসনায় আছে ঈশ্বরের স্তবগানের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে নাচা। এতে আত্মীয়-প্রতিবেশী-শিষ্যদের এবং নগরবাসীর অনেকেই শামস্-এর বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে উঠল। এই বিরোধিতায় বিরক্ত হয়েই হয়তো কাউকে না জানিয়ে ১২৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শামস্ একদিন হঠাৎ কোনিয়া ছাড়লেন। তাঁর বিরহে ব্যাকুল রুমি। জ্যেষ্ঠপুত্র ওয়ালাদ খুঁজে খুঁজে শামস্-কে ফিরিয়ে আনলেন দামাস্কাস থেকে। প্রিয় মিলনে রুমির বিষাদ কাটল, আর আরও চটল শামস্-এর শত্রুরা। এর বছর খানিক পর শামস্ আবার অদৃশ্য হলেন। ঐতিহাসিকেরা অনেকেই মনে করেন (যদিও মতভেদ আছে) যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল এবং ষড়যন্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন রুমির কনিষ্ঠ পুত্র আলাদিন।

রুমির সঙ্গে সংযোগের পরিবর্তে নিজের মাথা দেওয়ার কথাই যেন এবার সত্য হয়ে উঠল। শোক একটু সামলে, রুমি এবার নিজেই খুঁজতে বেরোলেন। খুঁজতে খুঁজতে দামাস্কাসে পৌঁছে একদিন তাঁর মনে হল এ বৃথা অন্বেষণ। তিনি বলে উঠলেন, কেন খুঁজব তাকে? সে আর আমি তো একই। তারই নির্যাস আমার মধ্যে দিয়ে কথা বলে। আমি কি এতদিন তবে নিজেকেই খুঁজেছিলাম (শামস্-ই-তাবরিজ, রুমি, অনুবাদ,লেখক, কোলম্যান বার্ক অনুসারে) রুমি লিখে ফেললেন দীর্ঘ কবিতার বই দিওয়ান-ইশামস্-ই তবরিজি। অবশ্য তাঁর সেরা বই হল মসনবি নামক কাব্যসমুচ্চ। এই বইটির গুরুত্ব শুধু কাব্য সাহিত্যে নয়, ধর্ম সাহিত্যেও অপরিসীম। বলা হয়, মুসলমানেরা তিনটি গ্রন্থের সঙ্গে শরিফ শব্দটি যুক্ত করেন, কুরআন শরিফ, হাদিস শরিফ ও মসনবি শরিফ। মসনবি সম্বন্ধে এক কবি বলেছেন, মসনবীয়ে মওলবীয়েমা-নবী হাস্তকুরান দর্জবানে পাহ্লবী। এর বাংলা অর্থ, অন্তর্মুখী মৌলবীর মসনবি, ফার্সি জবানে কুরআন-স্বরূপ। (অনুবাদ, মোস্তাক আহ্মাদ)

শামস্-ই তবরিজি এবং জালালউদ্দিন রুমি ত্রয়োদশ শতকের এই দু’টি মানুষকে নিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে বসে এলিফ শাফাক নামের তুরস্কের এক লেখিকা একটি উপন্যাস লিখে ফেললেন। ইংরেজিতে সে উপন্যাসের নাম, প্রেমের চল্লিশ বিধি বা (ফোর্টি রুলস অব লাভ) Forty Rules of Love । এই অন্তঃস্থিত উপন্যাসটির নাম ‘স্যুইট ব্লাসফেমি’ বা ‘মধুর ধর্মবিরোধ’। এটি হল তাঁর সতেরোটি বইয়ের  মধ্যে একাদশ এবং সর্বাধিক জনপ্রিয়গুলির মধ্যে একটি। উপন্যাসটিতে দু’টি কাহিনি সমান্তরালভাবে বয়ে চলে। একটি সমকালীন সময়ে ম্যাসাচুসেটস্-এর নর্দ্যাম্পটনের, অন্যটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পারস্যের। প্রথমটিতে প্রধান চরিত্র আপাত সুখী এক ইহুদি পরিবারের তিন সন্তানের মা এলা রুবিন স্টাইন। এলা একটি সাহিত্য পত্রিকায় কাজ নেয়। তাকে আজিজ জাহারা নামের এক নতুন লেখকের ‘স্যুইট ব্লাসফেমি’ বা ‘মধুর ধর্মবিরোধ’ নামে একটি উপন্যাস রিভিউ করতে দেওয়া হয়; এই কাহিনি আসলে শামস্-ই তবরিজি ও রুমির। ভিতরের কাহিনিতে যখন তাঁদের নাটকীয় সাক্ষাৎ এবং তারপরের ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতা চলছে, তখন বাইরের কাহিনিতে এলা উপন্যাসটি পড়তে পড়তে কৌতূহলী হয়ে আজিজের সঙ্গেই মেইলে যোগাযোগ স্থাপন করে। ক্রমশঃ এলা তার এত বছরের বিবাহিত জীবন, তার তিন সন্তান ও স্বামী সবাইকে ছেড়ে চলে যায় এই নতুন চেনা মানুষটির, ক্যানসারের আক্রমণে যার জীবন শেষের পথে। শামস্-এর প্রেম-সাধনায় চল্লিশটি নিয়ন্ত্রক বিধি। এই নিয়মগুলি কাহিনির মাঝে মাঝে বলা হয়েছে কখনও শামস্-এর মুখে, কখনও বা এই জীবন কাহিনির লেখক আজিজের মুখে। চল্লিশ নম্বর বিধিটি (Forty Rules of Love) অবশ্য আমরা শুনি উপন্যাসের শেষে এলার মুখে, যখন সে তার মেয়েকে দূর দেশ থেকে টেলিফোন করে।

সেই কথা কটি হল, ‘প্রেমহীন জীবন গুরুত্বহীন। নিজেকে প্রশ্ন করো না কী রকম ভালোবাসা তোমার চাই, আধ্যাত্মিক না জড়বাদী, স্বর্গীয় না জাগতিক, পাশ্চাত্যের না প্রাচ্যের… বিভাজন আরও বিভাজনকেই ডেকে আনে। প্রেমের কোনও তকমা, কোনও সংজ্ঞানেই। প্রেম যা সে তাই, পবিত্র ও সরল।’ ‘প্রেম-ই-জীবন-বারি আর প্রেমিক হলো আগুনের আত্মা।

‘যখন আগুন জলকে ভালোবাসে, তখন বিশ্বজগৎ ভিন্নভাবে ঘোরে।’

আলোচ্য গ্রন্থ: ‘Forty Rules of Love’ by Elif Shafak. 2nd Penguin Edition– 2015

নীলাঞ্জন শাণ্ডিল্য
ভারতীয় প্রাবন্ধিক

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ