বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

শিক্ষাক্রম: শিশুবান্ধব সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে যে সব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিৎ

শিশুবান্ধব সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রনয়ণ ও বাস্তবায়নের সময় নানাদিকে লক্ষ্য রাখতে হয় শিক্ষাক্রম প্রণেতা ও বাস্তবায়নকারীদের, কিন্তু সেগুলো কী?

সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদেরকে বা শিশুদেরকে পর্যাপ্ত জ্ঞান সরবারহ করার মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন ঘটিয়ে সমাজের দায়িত্বশীল সদস্যরুপে প্রতিষ্ঠা করা। সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষার আরও একটি উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন ইতিবাচক বিষয়ের প্রতিফলন ঘটানো। শিক্ষার্থীদেরকে সমাজের যোগ্য ও দায়িত্বশীল সদস্য বা কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে এবং তাদের মধ্যে সমাজের যাবতীয় ভালো দিকগুলোকে প্রতিফলিত করতে উপযুক্ত সামাজিক বিজ্ঞান শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যখনই শিখন ও শেখানো নিয়ে আলোচনা চলে আসে তখন একটি সামগ্রিক নির্দেশনার (overall guideline) প্রয়োজন খুবই অনুভব করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত জ্ঞান সরবরাহে সহায়ক হবে। শিখন-শেখানো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সামগ্রিক নির্দেশনার প্রয়োজন হয় তাই হলো শিক্ষাক্রম; আর এ শিক্ষাক্রম যখন সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষার নির্দেশনা প্রদান করে তখন তাকে সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম বলে।

এই নিবন্ধে শিক্ষাক্রম, সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম এবং একটি শিশুবান্ধব সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে কোন কোন বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিৎ তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে।

শিক্ষাক্রম কী

শিক্ষাক্রমের ইংরেজি পরিভাষা Curriculum (কারিকুলাম)। এটি ল্যাটিন শব্দ ‘currere’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘course of study’ অর্থাৎ ‘পাঠ্যবিষয়’। আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি ল্যাটিন শব্দ ‘currer’ থেকে এসেছে। এর অর্থ হল ‘ঘোড় দৌড়ের মাঠ’। শাব্দিক অর্থে যাই হোক না কেন, আভিধানিক অর্থে শিক্ষাক্রম বলতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য পরিচালিত কোর্সকে বুঝায়।

শিক্ষাক্রম হলো শিক্ষা পরিকল্পনা; যা বাস্তবায়নের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃক পরিকল্পিত ও পরিচালিত যাবতীয় শিখন-শেখানো কার্যাবলি যা বিদ্যালয়ের ভিতরে বা বাইরে দলগত বা এককভাবে সম্পন্ন করা হয়।

হিলডা তাবা (১৯৬২), যুগের চিন্তাভাবনার অবয়বহীন ফসলই হলো শিক্ষাক্রম।

হুইলার (১৯৬৭) এর মতে, শিক্ষাক্রম হলো শিক্ষার উদ্দেশ্য, শিখন অভিজ্ঞতা নির্বাচন, বিষয়বস্তু শনাক্তকরণ, বিষয়বস্তু সংগঠন, মূল্যায়ন ইত্যাদির একটি বৃত্তাকার গতিশীল কার্যক্রমকে।

সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম কী?

সামাজিক বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট যাবতীয় বিষয় যেমন- নৃ-বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, পৌরনীতি, ভূগোল, পরিবেশ ও অর্থনীতির প্রয়োজনীয় অংশ শিক্ষার্থীদেরকে শেখানোর জন্য যে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয় তা হলো সামজিকবিজ্ঞান শিক্ষাক্রম।

শিশু কারা?

বয়সের তারতম্যের কারণে আমরা কাউকে শিশু, কাউকে যুবক, কাউকে বৃদ্ধ বলে থাকি। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে ১৮ বছরের কম বয়সী যে-কোনো মানব সন্তানকেই শিশু বলা হয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান শিশু আইন, ২০১৩ অনুসারে অনুর্ধ্ব ১৮ বছর পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বয়সের ব্যক্তিরা অর্থাৎ শিশুরা মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।

শিশুবান্ধব শিক্ষাক্রম

সাধারণভাবে বলতে গেলে এভাবে বলা যায়, যে শিক্ষাক্রমের অধীন ত্রুটিমুক্তিভাবে শিখন-শেখানো কার্যক্রমের মাধ্যমে চাহিদা বা প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ততম উপায়ে শিশুদেরকে যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপন করা যায় তা হলো শিশুবান্ধব শিক্ষাক্রম।

শিশুবান্ধব সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম

ত্রুটিমুক্ত ও উপযুক্ততম উপায়ে শিশুদেরকে প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিকবিজ্ঞানের যাবতীয় বিষয়ের ওপর শিক্ষাদান করার করার জন্য যে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয় তাকে আমরা শিশুবান্ধব সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম বলতে পারি।

শিশুবান্ধব শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে যেসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে

সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রমের বৈশিষ্ট্য হলো এ শিক্ষাক্রমের অধীন শিক্ষার্থীরা মানব সমাজের বিবর্তন, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনধারা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, জাতীয়তাবোধ, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা লাভ করার সুযোগ পায়। এ শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও উন্নয়নের সময় খেয়াল রাখা উচিৎ এটি যতটা সুস্পষ্ট করা যায় যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করতে সক্ষম হয় এবং সামাজিকবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয় শাখার ওপর সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারে।

পুর্বেই বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুসারে অনুর্ধ্ব ১৮ বছরের ব্যক্তিদের শিশু হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এই বয়সের ছেলেমেয়ার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী। নিচে উল্লেখ করা হলো একটি শিশুবান্ধব শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে যেসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিৎ-

  • অন্য সকল বিষয় ও সকল বয়সের শিক্ষাক্রমের মতো শিশুদের জন্য প্রণীত সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম যাতে সুস্পষ্ট হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • মানবসমাজের বিবর্তন সম্পর্কে যাতে শিশুরা উপযুক্ত ধারণা পেতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • ইতিহাস ও ঐতিহ্য সামাজিকবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, এ দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে যে শিশুরা এসবের জ্ঞানলাভ থেকে বঞ্চিত না হয়।
  • মানবসমাজের বিবর্তনের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির বিবর্তনও সামজিকবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচনা বিষয়; শিশুদেরকে সংস্কৃতির বিবর্তন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা যাতে পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • শিশুরা যাতে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করে পথ চলতে পারে সেদিকে সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রণেতা ও বাস্তবায়নকারীদের নজর দিতে হবে।
  • শিশুদের জন্য সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তারা যাতে পরিবেশ ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে ও ভালোবাসতে এবং পরিবেশের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ হতে পারে।
  • আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক যাবতীয় প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে শিশুদের সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রমে গুরুত্বের সাথে স্থান দেওয়া উচিৎ; বিশেষ করে আবহাওয়া ও জলাবায়ুর পরিবর্তনে সমস্যা মোকাবেলায় শিশুরা যাতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে সেদিকে সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষক্রম প্রণেতা ও বাস্তবায়নকারীদের লক্ষ্য রাখা উচিৎ।
  • সামাজিক নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনধারণে দক্ষ করে গড়ে তোলা সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রমের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য তাই এ দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রমে শিশুদেরকে মৌলিক অধিকার ও সংক্রান্ত বিষয়সমূহে স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করতে হবে।
  • ব্যক্তি, লিঙ্গ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বেশেষে সকলের সঙ্গে সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের মানসিকতা যাতে শিশুরা অর্জন করতে সক্ষম হয় সে বিষয়ে শিক্ষাক্রম প্রণেতা ও বাস্তনায়নকারীদের লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • বর্তমান সময়ে খুবই চর্চিত বিষয় হলো জেন্ডার; শিশুদের শিক্ষাক্রমে জেন্ডার, জেন্ডার সাম্য, জেন্ডার সচেতনতা ইত্যাদি সম্পর্কে শিশুদেরকে ইতিবাচক হিসেবে গড়ে তোলার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • শিশুদের জন্য সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রণেতা ও বাসতবায়নকারীদের বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এ শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিশুরা নিজের দেশ, দেশের ইতিহাস, দেশের ঐতিহ্য ও ঐতিহ্য সম্পর্কে উপযুক্ত ধারণালাভ করতে সক্ষম হয় এবং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়।
  • ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারজ্ঞান ও সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; শিশুরা যাতে যথেষ্ট জ্ঞানী ও দক্ষ হয়ে উঠতে পারে সেদিকে সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রণেতা ও বাস্তবায়নকারীদের লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • দেশপ্রেমের পাশাপাশি বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ যাতে শিশুদের মধ্য জন্ম নেয় সেদিকেও সামজিকবিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রণেতা ও বাস্তবায়নকারীদের লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • শিল্প, সাহিত্য, প্রযুক্তি এবং সমাজসংশ্লিষ্ট সকল উপযুক্ত বিষয়ের সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং সংযোগ স্থাপন করিয়ে দেওয়াও সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রমের একটি উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, শিক্ষাক্রম এসব নিয়ে শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণ করতে পারবে কি না এবং বাস্তবায়নের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে শিক্ষার্থীরা যা শিখছে তাতে ক্ষতিকর কোনো প্রভাব পড়ছে কি না বা অন্যান্য কোনো সমস্যার দেখা দিচ্ছে কি না। পাশাপাশি সম্ভাব্য সমস্যার সমাধান কী হবে সে সবের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।

শেষকথা

সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিশুদেরকে (শিক্ষার্থী) যথাযথ শিক্ষা প্রদানে মাধ্যমে তাদেরকে সক্রিয় করার চেষ্টা করা হয় যাতে তারা সমাজের একেকজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। অন্য সকল শিক্ষাক্ষেত্রের ন্যায় সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সময় সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিৎ যে, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এবং দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট জ্ঞান সরবরাহ করা হচ্ছে কি না। শিশুরা যাতে সাহিত্য, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য বিষয়াদির সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে সে দিক বিবেচনায় রাখাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মু. মিজানুর রহমান মিজানhttps://www.mizanurrmizan.info
শিক্ষার্থী, মাস্টার অব এডুকেশন, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা এবং স্বাধীন লেখক।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ