বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম সবচেয়ে বড়ো ক্রিকেট স্টেডিয়াম

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের নতুন অবকাঠামোতে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ভারত বনাম ইংল্যান্ড টেস্ট ম্যাচ দিয়ে।

আধুনিক ক্রীড়া জগতের অন্যতম একটি খেলার নাম ক্রিকেট, যা ইংল্যান্ডে উৎপত্তিলাভ করে। ক্রিকেট, ভারতী উপমহাদেশ অর্থাৎ ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ অনেকগুলো দেশে বেশ জনপ্রিয় একটি খেলা। ক্রিকেটের উন্মাদনা ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে খুব একটা লক্ষ্য করা না গেলেও সেখানে এর সমর্থক সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। অন্য খেলার মতো ক্রিকেটেও রয়েছে নানান রকমের রেকর্ড গড়া ও ভাঙ্গার আরও একটি খেলা। এ সকল রেকর্ড নিয়ে আমরা টুকিটাকি জানি। কিন্তু হঠাৎ যদি কেউ আপনাকে প্রশ্ন করে বসে যে, বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ক্রিকেট স্টেডিয়াম কোনটি? আপনার উত্তর কী হবে তখন? অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড বা এমসিজি? না, এটি এখন কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর নয়। এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ক্রিকেট স্টেডিয়াম হলো নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম (Narendra Modi Stadium)। এই নিবন্ধে আলোচনা করা হবে ভারত তথা বিশ্বের সেরা ক্রিকেট স্টেডিয়াম নিয়ে। চলুন, শুরু করা যাক।

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য

ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদের মোতেরা নামক স্থানে অবস্থিত নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম। ২০২১ সালের পূর্বে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম নামে কোনো স্টেডিয়াম ছিল না। ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই পুরোনো একটি স্টেডিয়ামকে এই নামে পুনরায় নামকরণ করা হয়। নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের পূর্বনাম মোতেরা স্টেডিয়াম (Motera Stadium)। এই স্টেডিয়াম সরদার বল্লবভাই প্যাটেল স্টেডিয়াম (Sardar Vallabhbhai Patel Stadium) নামেও পরিচিত বলে কেউ কেউ বলেন, যা সত্য নয়।

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামটি সর্দার প্যাটেল স্পোর্টস এনক্লেভ (Sardar Vallabhbhai Patel Sports Enclave) কমপ্লেক্সের মধ্যে অবিস্থিত। মোতেরা স্টেডিয়াম নামে ১৯৮৩ সালে এই স্টেডিয়ামটি নির্মান করা হয়। তখন এর দর্শক ধারণ ক্ষমতা ধরা হয়েছিল ৫৪০০০ জন। মোতেরা স্টেডিয়ামকে নতুন করে নির্মান করার পরামর্শ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরামর্শ অনুযায়ী ২০১৫ সালে এটি ভেঙে ফেলার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মোতেরা স্টেডিয়ামের নতুন অবকাঠামো খুলে দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগমন উপলক্ষে আয়োজিত ‘নামাস্তে ট্রাম্প’ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এর ঠিক এক বছর পরে ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ তারিখে ভারত বনাম ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচ শুরু হবার কয়েক ঘণ্টা আগেই পরিবর্তন হয় নাম। আহমেদাবাদের মোতেরা স্টেডিয়াম পরিচিত হয় নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম নামে। বর্তমান অবকাঠামোতে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণ ক্ষমতা ১ লক্ষ ৩২ হাজার জন।

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের পুরোনো অবকাঠামোতে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১২-১৬ নভেম্বর, ১৯৮৩, ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের মাধ্যমে। আর নতুন অবকাঠামোতে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ভারত বনাম ইংল্যান্ড টেস্ট ম্যাচ দিয়ে। এই প্রথম ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে বদলে যায় স্টেডিয়ামের নাম।

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের দুই প্রান্তের নাম আদানি এবং রিলায়েন্স।

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের পূর্বনাম কি সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল স্টেডিয়াম?

অনেকেই বলছেন যে, নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম নামকরণের পূর্বে এই স্টেডিয়ামের নাম ছিল সর্দার বল্লবভাই স্টেডিয়াম, যেটি তখন মোতেরা স্টেডিয়াম নামেও পরিচিত ছিল। কিন্তু দেখা যায় এই একই নামে আরও একটি স্টেডিয়াম রয়েছে আহমেদাবাদ শহরেই। সেই স্টেডিয়ামের নামও সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামটি অবস্থিত শহরের নভরংপুরাতে। মোতেরার স্টেডিয়াম নির্মানের আগে সেখানেই আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো।

নভরংপুরার সর্দার বল্লবভাই স্টেডিয়ামে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ২৫ নভেম্বর, ১৯৮১। ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যে অনুষ্ঠিত এটি ছিল এই স্টেডিয়ামের একমাত্র একদিনের আন্তর্জান্তিক ম্যাচ। এরপর ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া মহিলা দলের টেস্ট অনুষ্ঠিত হয় ২ টি, যথাক্রমে- ৩-৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৪ এবং ২৩-২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৪।

পরবর্তিতে মোতেরা স্টেডিয়াম খুলে দেওয়া হলে আর কখনোই নভরংপুরায় আন্তর্জাতিক ম্যাচ ফেরেনি।

‘নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম’ এর পূর্বনাম ‘সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল স্টেডিয়াম’ নয়। এর পূর্বনাম ‘মোতেরা স্টেডিয়াম’।

মোতেরা স্টেডিয়ামের নাম সত্যিকার অর্থে সর্দার বল্লবভাই প্যাটেলের নামে ছিল না

যে স্টেডিয়ামের নাম ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নামে ‘নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম’ নামকরণ করা হয়েছে, সে স্টেডিয়ামের নাম কখনোই সর্দার বল্লবভাই প্যাটেলের নামে ছিল না। কারণ একই নামে আরেকটি একই শহরে দ্বিতীয় স্টেডিয়াম থাকা শোভনীয় নয়। তবে যা ঘটেছে তা হলো, আহমেদাবাদে একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্স বানানো হয় এবং সেই কমপ্লেক্সের নাম দেওয়া হয় সর্দার বল্লবভাই প্যাটেলের নামে।

এই সর্দার বল্লবভাই স্পোর্টস এনক্লেভ কমপ্লেক্সেটি এমন, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন খেলার জন্য ভিন্ন ভিন্ন মাঠ বা স্টেডিয়াম রয়েছে। ক্রিকেট, বাস্কেটবল, ভলিবল, হকি, টেনিস, ডাইভিং, সুইমিং, রেসলিং, জুডোসহ আরও বেশ কিছু খেলার জন্য ভিন্ন ভিন্ন মাঠ ও জায়গা রয়েছে, চর্চার জন্যও রয়েছে ভিন্ন আয়োজন। এই সব কিছুর মধ্যে অবস্থিত একটি স্টেডিয়ামের নাম ছিল মোতেরা স্টেডিয়াম। যেটি ক্রিকেটের জন্য নির্ধারিত ছিল। কমপ্লেক্সের নাম প্যাটেলের নামে হলেও এই ক্রিকেট স্টেডিয়ামটির নাম মোতেরা নামক জায়গার নামেই ছিল।

কেন মোতেরা স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম রাখা হলো?

মোতেরা স্টেডিয়ামকে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত করানোর জন্য যে সকল বিষয় প্রধান বলে দেখছেন সবাই তা অল্প কথা বলা হলো-

নরেন্দ্র মোদী গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। একই সময়ে তিনি গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছিলেন। যে সময় নরেন্দ্র মোদী গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন, তখনই তিনি চেয়েছিলেন এই স্টেডিয়ামকে নতুন রুপ দেওয়ার। স্টেডিয়ামটির বর্তমান অবকাঠামোর মতো একটি অবকাঠামোতে তোলার মূল পরিকল্পনাই ছিল ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর। এই কারণেই তাকে সম্মান জানানোর জন্য স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করা হয়।

নিম্নোক্ত বিষয়গুলো এক হয়ে এই স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত হয়

  • গুজরাতের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
  • গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি নরেন্দ্র মোদী
  • মোতের স্টেডিয়ামকে নতুন রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন মোদী
  • ভারতের পরপর দুইবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী
  • রাজনৈতিক প্রভাব

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের কিছু বিশেষত্ব

  • সবচেয়ে বড়ো ক্রিকেট স্টেডিয়াম
  • একসাথে ১ লক্ষ ৩২ হাজার দর্শক বসে খেলা উপভোগ করতে পারবে
  • মাঠের সাইজ ১৮০ গজ x ১৫০ গজ
  • সারফেসে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ঘাস
  • আলাদা ১১ টি পিচ, যেগুলো লাল ও কালো মাটির তৈরি
  • একই রকম মাটি দিয়ে মূল খেলার পিচ ও প্র্যাকটিস করার পিচ বানানো হয়েছে
  • পানি নিষ্কাসনে রয়েছে অত্যাধুনিক পদ্ধতি, মুষলধারে বৃষ্টি হবার ৩০ মিনিটের মধ্যেই মাঠ শুকানো যাবে
  • উঁচু লম্বা টাওয়ারের পরিবর্তে স্টেডিয়ামের ছাদে বসানো হয়েছে এলইডি লাইট, এতে খেলার সময় খেলোয়াড়দের ছায়া মাঠে পড়বে না; এই প্রযুক্তি উপমহাদেশে প্রথম ব্যবহার করা হলো কোনো স্টেডিয়ামে।
  • দুইটির পরিবর্তে চারটি ড্রেসিং রুম, এতে দিনে দুইটি ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব হবে।
  • স্টেডিয়ামের সাথেই রয়েছে ক্রিকেট অ্যাকাডেমি, ইনডোর প্র্যাকটিস সুবিধা এবং আলাদা দুইটি প্র্যাকটিস-গ্রাউন্ড, এতে রয়েছে আলাদা প্যাভিলিয়ন

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ

এই স্টেডিয়ামে ১৯৮৭, ১৯৯৬ এবং ২০১১ সালের বিশ্বকাপের বেশ কিছু ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেরও ফাইনাল ম্যাচসহ কয়েকটি ম্যাচ এখানে হবার কথা রয়েছে।

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের কিছু ঐতিহাসিক রেকর্ড

আগের অবকাঠামোতে যখন মোতেরা স্টেডিয়াম নাম ছিল এই স্টেডিয়ামের, স্বাভাবিকভাবে রেকর্ডগুলো তখনেরই।

  • সুনীল গাভাস্কার টেস্ট ক্রিকেটে ১০,০০০ রান সম্পন্ন করেন নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০,০০০ রানের ঘটনা সেবারই প্রথম। সুনীল গাভাস্কার এই মাইলফলক স্পর্শ করেন পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৮৭ সালের ৭ মার্চ।
  • কপিল দেব ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টে ৯ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন ২৯৮৩ সালে।
  • কপিল দেব ১৯৯৫ সালে নিজের ক্যারিয়ারে ৪৩২তম উইকেট নিয়ে সেই সময়ের সেরা উইকেট টেকার হয়েছিলেন।
  • জাভাগাল শ্রীনাথ চতুর্থ ইনিংসে ছয় উইকেট নেওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
  • সচিন টেন্ডুলকার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০০ রান করেছিলেন ১৯৯৯ সালের ৩০ অক্টোবর।
  • সচিন টেন্ডুলকার ১৮,০০০ রান সম্পন্ন করেন এই স্টেডিয়ামে। একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে সচিন টেন্ডুলকার এই কীর্তি গড়েন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, ২০১১ ওয়ার্ল্ড কাপ চলাকালীন। দিনটি ছিল ২৪ মার্চ, ২০১১। অবশ্য ওই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন যুবরাজ সিং।
  • গোলাপি বলে ভারত বনাম ইংল্যান্ড প্রথম দিবারাত্রি টেস্ট অনুষ্ঠিত ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১।
মু. মিজানুর রহমান মিজানhttps://www.mizanurrmizan.info
শিক্ষার্থী, মাস্টার অব এডুকেশন, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা এবং স্বাধীন লেখক।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
এখানে আপনার নাম লিখুন

এই বিভাগের সাম্প্রতিক নিবন্ধ